Class 10Question Paper

Madhyamik 2026 Bengali Question Paper Solution | মাধ্যামিক ২০২৬ বাংলা প্রশ্নপত্র সমাধান সহ

Madhyamik 2026 Bengali Question Paper Solution

মাধ্যামিক ২০২৬ পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা প্রশ্নপত্রের সম্পূর্ণ সমাধান এখানে দেওয়া হলো। এই পোস্টে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি অংশের উত্তর সহজ ও পরিষ্কার বাংলা ভাষায় ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। গদ্য, পদ্য, ব্যাকরণ ও রচনাভাগ—সব অংশের সমাধান একসাথে পেয়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিতে পারবে।

বাংলা প্রশ্নপত্র ২০২৬
MCQ Mode

১. সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করোঃ

১.১ “ছদ্মবেশে সেদিন হরিদার রোজগার মন্দ হয়নি।”—কোন্ ছদ্মবেশে?

পুলিশ
পাগল
বাইজি
বৈরাগী
গ. বাইজি

১.২ “আমি বাবু ভারী ধর্মভীরু মানুষ।”—‘ধর্মভীরু’ মানুষটি কে?

রামদাস
গিরিশ মহাপাত্র
জগদীশবাবু
নিমাইবাবু
খ. গিরিশ মহাপাত্র

১.৩ অমৃতের মতো ছেলে পেলে ইসাবের বাবা কতজনকে পালন করতে পারেন?

এগারোজনকে
চৌদ্দজনকে
কুড়িজনকে
একুশজনকে
ঘ. একুশজনকে

১.৪ “আমাদের ডান পাশে ধস / আমাদের বাঁয়ে ___________ ”

সমুদ্র
গিরিখাদ
পর্বত
জনপদ
খ. গিরিখাদ

১.৫ ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার উৎসগ্রন্থ—

অগ্নিবীণা
সাম্যবাদী
প্রলয়শিখা
সর্বহারা
ক. অগ্নিবীণা

১.৫ ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার উৎসগ্রন্থ—

অগ্নিবীণা
সাম্যবাদী
প্রলয়শিখা
সর্বহারা
ক. অগ্নিবীণা

১.৬ কুম্ভকর্ণের দেহ কোথায় ভূপতিত?

গঙ্গা তীরে
যমুনা তীরে
সিন্ধু তীরে
সরযূ তীরে
গ. সিন্ধু তীরে

১.৭ “বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে যত কম থাকে ততই ভালো।” — কী কম থাকলে ভালো হয়?

ছন্দ
অলংকার
পরিভাষা
অভিধানিক অর্থ
খ. অলংকার

১.৮ “নিবের কলমের মান মর্যাদা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন একমাত্র ___________ ”

অন্নদাশঙ্কর রায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
সুকুমার রায়
সত্যজিৎ রায়
ঘ. সত্যজিৎ রায়

১.৯ পরিভাষার উদ্দেশ্য হল—

কোনো বিষয়কে বর্ণনা করা
অর্থ সুনির্দিষ্ট করা
ভাষার সংক্ষেপ ও অর্থ সুনির্দিষ্ট করা
অর্থের ব্যাখ্যা দেওয়া
গ. ভাষার সংক্ষেপ ও অর্থ সুনির্দিষ্ট করা

১.১০ রামের চেয়ে শ্যাম ভালো খেলে। — রেখাঙ্কিত অংশ হল—

অপাদান কারক
সম্বন্ধ পদ
কর্তৃকারক
কর্মকারক
ক. অপাদান কারক

১.১১ বাক্যে কর্তা ও ক্রিয়া যদি একই ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয় তবে সেই কর্তাকে বলে—

উহ্য কর্তা
সহযোগী কর্তা
সমধাতুজ কর্তা
প্রযোজক কর্তা
গ. সমধাতুজ কর্তা

১.১২ যে সমাসের সাধারণ নিয়মে ব্যাসবাক্য হয় না কিংবা ব্যাসবাক্য নির্ণয় করতে গেলে অন্য পদের প্রয়োজন হয়, সেই সমাসের নাম—

দ্বন্দ্ব সমাস
দ্বিগু সমাস
অলোপ সমাস
নিত্য সমাস
ঘ. নিত্য সমাস

১.১৩ ‘ক্ষণস্থায়ী’—পদটির সমাস হল—

করণ তৎপুরুষ
নিমিত্ত তৎপুরুষ
ব্যাপ্তি তৎপুরুষ
অপাদান তৎপুরুষ
গ. ব্যাপ্তি তৎপুরুষ

১.১৪ দুটি সরল বাক্য যখন সংযোজক অব্যয় দ্বারা যুক্ত হয় তখন তাকে বলে—

জটিল বাক্য
যৌগিক বাক্য
মিশ্র বাক্য
নির্দেশক বাক্য
খ. যৌগিক বাক্য

১.১৫ ফেলে আসা দিনগুলি আমার মনে পড়ে গেল। — বাক্যটি হল—

সরল বাক্য
জটিল বাক্য
যৌগিক বাক্য
মিশ্র বাক্য
ক. সরল বাক্য

১.১৬ যে বাচ্যে কর্ম প্রধান হয়ে ওঠে তাকে বলে—

কর্তৃবাচ্য
কর্মবাচ্য
ভাববাচ্য
কর্মকর্তৃবাচ্য
খ. কর্মবাচ্য

১.১৭ ‘তোমার গল্প আমি ছাপিয়ে দেব।’ — এটি কোন্ বাচ্যের উদাহরণ?

কর্তৃবাচ্য
কর্মকর্তৃবাচ্য
কর্মবাচ্য
ভাববাচ্য
ক. কর্তৃবাচ্য

২. কম বেশি ২০ টি শব্দে উত্তর দাওঃ

২.১ যে কোন চারটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

২.১.১ “কী আশ্চর্য! চমকে ওঠে ভবতোষ”—ভবতোষের চমকে ওঠার কারণ কী?

উত্তরঃ সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে ছদ্মবেশধারী হরিদার শান্ত, গভীর ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং তার আধ্যাত্মিক কথাবার্তা শুনে ভবতোষ বিস্মিত হয়ে চমকে উঠেছিল।

২.১.২ অমৃতের বয়স কত?

উত্তরঃ পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল’ গল্প অনুযায়ী অমৃতের বয়স ছিল প্রায় দশ বছর।

২.১.৩ “এই ভীষণ মধুর শব্দ শুনিতে শুনিতে সর্পিল অবশ, অবসন্ন হইয়া আসিতেছে”—কোন্ ‘ভীষণ মধুর শব্দ’ উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে অবসন্ন করেছিল?

উত্তরঃ এখানে ‘ভীষণ মধুর শব্দ’ বলতে নদীর অবিরাম কলকল ধ্বনি বা জলপ্রবাহের শব্দকে বোঝানো হয়েছে, যা নদেরচাঁদের মনে এক ধরনের তন্দ্রাচ্ছন্ন অবসাদ সৃষ্টি করেছিল।

২.১.৪ “মুখ ফিরাইয়া হাসি গোপন করিল”—হাসি গোপন করার কারণ কী?

উত্তরঃ গিরিশ মহাপাত্রের অদ্ভুত পোশাক, ভান করা ধর্মভীরু আচরণ এবং কথাবার্তার অসংগতি দেখে অপূর্বের হাসি পেয়ে যায়; কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সে সেই হাসি গোপন করে।

২.১.৫ “সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়”—কী নিয়ে শোরগোল পড়ে?

উত্তরঃ তপনের লেখা গল্পটি যখন ‘সন্ধাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তখন সেই অপ্রত্যাশিত সাফল্য নিয়েই সারা বাড়িতে হৈচৈ ও শোরগোল শুরু হয়ে যায়।

২.২ যে কোন চারটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

২.২.১ “দণ্ডচারি এই মতে”—এক দণ্ড মানে কত সময়?

উত্তরঃ প্রাচীন ভারতীয় সময় গণনা অনুযায়ী এক দণ্ডের পরিমাণ হলো ২৪ মিনিট। তখন সময় নির্ণয়ে এই এককটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হতো।

২.২.২ “ক্ষমা করো” — এই উক্তির মধ্য দিয়ে কবির কী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?

উত্তরঃ এই উক্তির মাধ্যমে কবি অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং অতীতের অন্যায়ের জন্য অনুশোচনা ও মানবিক ক্ষমার আহ্বান জানিয়েছেন।

২.২.৩ “প্রাণমিয়া, ধাত্রীর চরণে,” — এই ‘ধাত্রী’র পরিচয় দাও।

উত্তরঃ এখানে ‘ধাত্রী’ বলতে ইন্দ্রজিতের ধাত্রীমাতা প্রভাষাকে বোঝানো হয়েছে। তিনি স্নেহশীল ও মমতাময়ী নারী, যার ছদ্মবেশে লক্ষ্মী দেবী লঙ্কায় উপস্থিত হয়েছিলেন।

২.২.৪ “সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন” — আগুন ধরার কারণ কী?

উত্তরঃ এখানে আগুন ধরার কারণ হিসেবে ভয়াবহ যুদ্ধের বিভীষিকা ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যার ফলে চারদিকে আগুনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।

২.২.৫ “আমাদের পথ নেই আর” — তাহলে আমাদের কী করণীয়?

উত্তরঃ এই উক্তির মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আর পিছু হটার পথ নেই। তাই আমাদের উচিত সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়া।

২.৩ যে কোন তিনটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

২.৩.১ “তুমি সরল, আমি দুর্বল। তুমি সাহসী, আমি ভীরু” — এখানে ‘তুমি’ বলতে লেখক আসলে কাকে ইঙ্গিত করেছেন?

উত্তরঃ এখানে ‘তুমি’ বলতে লেখক আসলে কলমকে ইঙ্গিত করেছেন। লেখকের মতে কলম সরল ও সাহসীভাবে সত্য প্রকাশ করে, অথচ মানুষ হিসেবে লেখক নিজে অনেক সময় দুর্বল ও ভীরু হয়ে পড়েন।

২.৩.২ “যিনি কানে কলম গুঁজে দুনিয়া খোঁজেন” — তাকে কী বলে?

উত্তরঃ যিনি গভীর চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে জীবন ও জগতকে বোঝার চেষ্টা করেন, তাকে দার্শনিক বলা হয়।

২.৩.৩ “বিজ্ঞান চর্চায় এখনও নানা রকম বাধা আছে”—কোন্ বিষয়ে এখনও বাধা আছে?

উত্তরঃ বিজ্ঞানচর্চায় প্রধান বাধা হিসেবে উপযুক্ত বাংলা পারিভাষিক শব্দের অভাব এবং অনেক বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সহজ ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার অসুবিধার কথা বলা হয়েছে।

২.৩.৪ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির সঙ্গে কারা কাজ করেছিলেন?

উত্তরঃ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির সঙ্গে বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকরা একযোগে কাজ করেছিলেন, যাতে বাংলায় উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক পরিভাষা গড়ে তোলা যায়।

২.৪ যে কোন আটটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

২.৪.১ অনুক্ত কর্তা কাকে বলে?

উত্তরঃ যে বাক্যে কর্তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না হয়ে ক্রিয়া বা কর্মের মাধ্যমে বোঝানো হয়, সেই কর্তাকে অনুক্ত কর্তা বলা হয়। সাধারণত কর্মবাচ্য বা ভাববাচ্যে এমন কর্তা দেখা যায়।

২.৪.২ ‘জনে জনে’ নিমন্ত্রণ করেছি — নিম্নলিখিত পদটি কী জাতীয় কর্ম?

উত্তরঃ এখানে ‘জনে জনে’ পদটি বীপ্সা কর্মের উদাহরণ। কারণ একই কর্ম একাধিক ব্যক্তি বা বস্তুর ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তভাবে সম্পন্ন হওয়ার ভাব প্রকাশ পেয়েছে।

২.৪.৩ ‘আকাশবাণী’—সমাসবদ্ধ পদটির ব্যাসবাক্য সহ সমাসের নাম লেখো।

উত্তরঃ ‘আকাশবাণী’ শব্দটির ব্যাসবাক্য হলো—আকাশ হতে আগত বাণী। এখানে মধ্যবর্তী বিভক্তি লুপ্ত হয়েছে, তাই এটি মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাসের উদাহরণ।

২.৪.৪ দ্বিগু সমাসের একটি উদাহরণ দাও।

উত্তরঃ দ্বিগু সমাসে প্রথম পদটি সংখ্যাবাচক হয় এবং সমগ্র পদটি সমাহার বোঝায়। যেমন — ‘পঞ্চবটী’, অর্থাৎ পাঁচটি বটগাছের সমাহার।

২.৪.৫ অলোপ সমাস কাকে বলে?

উত্তরঃ যে সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি বা অনুসর্গ সম্পূর্ণভাবে লুপ্ত না হয়ে আংশিকভাবে রয়ে যায়, তাকে অলোপ সমাস বলে। সাধারণত লোকপ্রচলিত যুগ্মপদে এই সমাস দেখা যায়।

২.৪.৬ বাক্য নির্মাণের শর্তগুলির নাম উল্লেখ করো।

উত্তরঃ বাক্য সঠিকভাবে গঠিত হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত প্রয়োজন—
(১) আকাঙ্ক্ষা, (২) যোগ্যতা এবং (৩) আসত্তি।

২.৪.৭ ‘হয় বাংলা পড়ো, নয় ইংরেজি পড়ো।’—যৌগিক বাক্যে পরিবর্তন করো।

উত্তরঃ এই বাক্যটি সংযোজক অব্যয় ‘হয়—নয়’ দ্বারা যুক্ত দুটি সরল বাক্য নিয়ে গঠিত, তাই এটি ইতিমধ্যেই একটি যৌগিক বাক্য। অতএব আলাদা করে পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।

২.৪.৮ আবেগসূচক বাক্যের একটি উদাহরণ দাও।

উত্তরঃ বাহ! আজ কত সুন্দর দিন!

২.৪.৯ ‘বাড়িতে খবর দিয়েছেন।’—কর্মবাচ্যে রূপান্তর করো।

উত্তরঃ বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে।

২.৪.১০ কর্মকর্তৃবাচ্যের একটি উদাহরণ দাও।

উত্তরঃ শঙ্খ বাজে — এই বাক্যটি কর্মকর্তৃবাচ্যের উদাহরণ, কারণ এখানে শঙ্খ নিজেই কর্তার মতো কাজ করছে এবং আলাদা কোনো কর্তার উল্লেখ নেই।

৩. প্রসঙ্গ নির্দেশ সহ কম-বেশি ৬০ টি শব্দে উত্তর দাওঃ

৩.১ যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৩.১.১ “শুনেছেন হরিদা, কী কাণ্ড হয়েছে?” — কারা একথা বলেছেন? ‘কাণ্ডটা’ কী ছিল?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার ঘরের আড্ডার সময় জগদীশবাবুর বাড়িতে ঘটে যাওয়া এক অদ্ভুত ঘটনার কথা উঠেছে।

এই উক্তিটি করেছে ভবতোষ, অনাদি ও তাদের সঙ্গীরা। তারা হরিদাকে জানাতে চেয়েছিল জগদীশবাবুর বাড়িতে ঘটে যাওয়া সেই আশ্চর্য ঘটনাটি। ‘কাণ্ডটা’ ছিল এই যে, এক বিরাগী সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে এসে কয়েকদিন অবস্থান করেন। জগদীশবাবু তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি প্রদর্শন করেন—পায়ের ধুলো নেন এবং বিদায়ের সময় একশো এক টাকার প্রণামী দিতে চান। কিন্তু সেই সন্ন্যাসী সমস্ত অর্থ ও বৈষয়িক লোভ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিঃস্বভাবেই চলে যান। এই অস্বাভাবিক ও নাটকীয় ঘটনাই গল্পে ‘কাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩.১.২ “একটু মমতা বোধ করিল বটে,” — কিসের প্রতি কার মমতা বোধ হয়েছিল? তার মমতা বোধের কারণ কী?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: আলোচ্য অংশটি নদেরচাঁদকে কেন্দ্র করে লেখা গল্পের সেই মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত, যখন প্রবল বর্ষায় স্ফীত নদীর পাশে বসে নদেরচাঁদ তার ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে প্রকৃতির এক গভীর যোগ অনুভব করছে।

এখানে নদেরচাঁদের মমতা বোধ হয়েছিল তার স্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিটির প্রতি। পাঁচ দিন ধরে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বসে সে তার বউকে উদ্দেশ করে বিরহ-বেদনায় ভরা দীর্ঘ একটি চিঠি লিখেছিল, যা তার পকেটে রাখা ছিল। নদীর স্রোতে একের পর এক চিঠির পাতা ছুঁড়ে দেওয়ার সময় মুহূর্তের জন্য তার মনে সেই চিঠির প্রতি মায়া জেগে ওঠে।

এই মমতা বোধের কারণ ছিল চিঠিটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তার ব্যক্তিগত আবেগ, একাকিত্ব ও দাম্পত্য স্মৃতি। তবে নদীর উন্মত্ত স্রোতের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার আকর্ষণ সেই মমতাকে ছাপিয়ে যায়, যা নদেরচাঁদের মানসিক টানাপোড়েন ও আবেগপ্রবণ স্বভাবকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

৩.২ যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৩.২.১ “হাসিবে মেঘবাহন” — ‘মেঘবাহন’ কে? তিনি হাসিলেন কেন?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে রাবণ ও ইন্দ্রজিতের কথোপকথনের সময় এই উক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে যুদ্ধের পূর্বক্ষণে ইন্দ্রজিত তার আত্মবিশ্বাস ও বীরত্ব প্রকাশ করছে।

এখানে ‘মেঘবাহন’ বলতে মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিতকেই বোঝানো হয়েছে। তিনি হাসিলেন কারণ রাবণ রামের পুনর্জীবন ও শক্তি নিয়ে কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ইন্দ্রজিত সেই আশঙ্কাকে তুচ্ছ মনে করে দৃপ্ত হাসি হাসে, কারণ তার বিশ্বাস ছিল—রাম একজন সাধারণ মানুষ মাত্র এবং পূর্বে দুইবার তাকে পরাজিত করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। নিজের অদম্য বীরত্ব, যুদ্ধদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস থেকেই ইন্দ্রজিত এই হাসি হেসেছিল।

৩.২.২ “আসছে নবীন — জীবনহারা অ-সুন্দরে কর্‌তে ছেদন!” — উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি প্রলয়কে কেবল ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে দেখাননি; বরং তাকে নতুন সৃষ্টির পূর্বাভাস হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আলোচ্য উক্তিটি সেই ভাবনারই কেন্দ্রীয় প্রকাশ।

এই উক্তির মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে এক নতুন যুগের আবির্ভাব আসন্ন। ‘নবীন’ বলতে এখানে নতুন জীবন, নতুন চেতনা ও নবজাগরণকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘জীবন-হারা অ-সুন্দর’ বলতে সেই সব জীর্ণ, অসুস্থ, অন্যায় ও মূল্যহীন সামাজিক কাঠামোকে নির্দেশ করা হয়েছে, যেগুলির মধ্যে আর প্রাণশক্তি নেই। কবির মতে, এই জীর্ণ ও অসুন্দরকে ছেদন বা নির্মূল না করলে নতুন ও সুন্দর জীবনের সৃষ্টি সম্ভব নয়।

অতএব প্রলয় এখানে ভয়ের নয়, বরং আশার বার্তা বহন করে। ধ্বংসের মধ্য দিয়েই সমাজের নবজন্ম ঘটে—এই বিপ্লবী ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিই উক্তিটির মূল তাৎপর্য।

8. কম বেশি ১৫০ টি শব্দে যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৪.১ ‘তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!’—কার এমন দুঃখ-অপমান বোধ হয়েছিল? তার এমন মনে হওয়ার কারণ কী?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: আশাপূর্ণা দেবীর রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের লেখা প্রথম গল্প পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর তার মনে যে গভীর মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়, আলোচ্য উক্তিটি সেই প্রসঙ্গেই বলা হয়েছে। এটি গল্পের একেবারে শেষ অংশের ভাবগত চূড়ান্ত প্রকাশ।

এই উক্তিটির মধ্যে তপনের দুঃখ ও অপমানবোধ প্রকাশ পেয়েছে। তপন অত্যন্ত সরল ও স্বপ্নমগ্ন কিশোর। একজন প্রকৃত লেখকের সংস্পর্শে এসে তার মনে লেখক হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগে এবং সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একটি গল্প লেখে। সেই গল্পটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার খবরে তপনের আনন্দের সীমা থাকে না। সে ভাবে, এবার সত্যিই সে একজন লেখক হয়ে উঠেছে।

কিন্তু পত্রিকাটি হাতে পেয়ে গল্প পড়তে গিয়ে তপন ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হয়। সে বুঝতে পারে, ‘কারেকশান’-এর নামে তার মেসোমশাই গল্পটিকে সম্পূর্ণ নিজের মতো করে বদলে দিয়েছেন। প্রকাশিত গল্পে তপনের ভাষা, ভাবনা ও অনুভূতির কোনো চিহ্নই আর নেই। তার নাম থাকলেও লেখাটি আর তার নিজের নয়। এই উপলব্ধিই তপনের মনে গভীর দুঃখ ও অপমানের জন্ম দেয়।

তপনের কাছে এটি শুধু একটি গল্প নষ্ট হওয়ার বিষয় নয়; এটি তার সৃজনশীল সত্তা ও আত্মসম্মানের উপর আঘাত। নিজের লেখা পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়তে হওয়া তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তাই তার মনে হয়—এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু হতে পারে না, এর চেয়ে বড় অপমান আর কিছু নেই।

এই দুঃখের মধ্য দিয়েই তপনের ‘জ্ঞানচক্ষু’ খুলে যায়। সে উপলব্ধি করে যে লেখকের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হলো নিজের কণ্ঠস্বর ও সততা। তাই সে দৃঢ় সংকল্প করে—ভবিষ্যতে যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয়, তবে নিজে গিয়ে দেবে, নিজের কাঁচা লেখাই দেবে। এই আত্মসম্মানবোধ ও সচেতনতার মধ্য দিয়েই গল্পের মূল বার্তা সম্পূর্ণতা পায়।

৪.২ “এই জানোয়ারটাকে ওয়াচ করার দরকার নেই”—‘জানোয়ার’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তাকে ‘ওয়াচ’ করার দরকার নেই কেন লেখা হয়েছে?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসিত বার্মায় বিপ্লবী দমন ও পুলিশি অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের মধ্যে এই উক্তিটি করা হয়েছে। পুলিশ-স্টেশনে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জেরা করার সময় জগদীশবাবু গিরীশ মহাপাত্রকে লক্ষ্য করে এই মন্তব্য করেন।

এখানে ‘জানোয়ার’ বলতে গিরীশ মহাপাত্রকেই বোঝানো হয়েছে। পুলিশের চোখে সে একজন অসুস্থ, দরিদ্র ও হাস্যকর চেহারার মানুষ—রোগা শরীর, নেবুর তেলের তীব্র গন্ধ, রঙচঙে পোশাক ও উদ্ভট সাজসজ্জায় তাকে মোটেই কোনো বিপজ্জনক রাজবিদ্রোহী বলে মনে হয় না। বাহ্যিক এই রূপের কারণেই জগদীশবাবু তাকে তাচ্ছিল্য করে ‘জানোয়ার’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তাকে ‘ওয়াচ’ করার দরকার নেই বলা হয়েছে, কারণ পুলিশ বাহ্যিক চেহারা ও আচরণের উপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সে নিরীহ এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন। তাদের ধারণা, এমন একজন দুর্বল ও অসংলগ্ন মানুষ কখনোই বিপ্লবী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে না। এই ভ্রান্ত ধারণার ফলেই প্রকৃত বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিক পুলিশের নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এই উক্তির মধ্য দিয়ে লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঔপনিবেশিক পুলিশব্যবস্থার অযোগ্যতা ও আত্মতুষ্ট মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। বাহ্যিক চেহারার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার এই প্রবণতাই শাসকশক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—এ কথা পাঠক স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

৫. কম বেশি ১৫০ টি শব্দে যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৫.১ “অস্ত্র ফ্যালো, অস্ত্র রাখো পায়ে”—কবি অস্ত্র ফেলতে বলেছেন কেন? অস্ত্র পায়ে রাখার তাৎপর্য কী?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: জয় গোস্বামীর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় কবি হিংসা, যুদ্ধ ও রক্তপাতের বিপরীতে মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও গানকে প্রতিরোধের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এই কবিতায় অস্ত্র ও গান—এই দুই বিপরীত শক্তির মুখোমুখি অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

কবি অস্ত্র ফেলতে বলেছেন, কারণ অস্ত্র মানুষের মধ্যে ঘৃণা, ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডেকে আনে। অস্ত্রের ব্যবহার সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, বরং মানুষকে আরও নিষ্ঠুর ও অমানবিক করে তোলে। কবির বিশ্বাস, হিংসা দিয়ে কখনও স্থায়ী শান্তি আনা যায় না। তাই অস্ত্র ত্যাগ করে গান, অর্থাৎ ভালোবাসা, প্রতিবাদ ও সৃজনশীলতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

অস্ত্র ‘পায়ে রাখা’-র তাৎপর্য হল অস্ত্রকে অবহেলা করা ও তার ক্ষমতাকে খর্ব করা। পায়ে রাখা মানে অস্ত্রকে আর ভয়ংকর বা শ্রদ্ধার বস্তু হিসেবে না দেখা, বরং তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। কবি বোঝাতে চেয়েছেন—মানুষ যখন গানকে বর্ম হিসেবে গ্রহণ করে, তখন অস্ত্র তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।

সুতরাং, অস্ত্র ফেলার আহ্বান শুধু যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য নয়, এটি মানবিক চেতনার বিজয়ের ঘোষণা। কবি এখানে গানকে এমন এক শক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন, যা রক্ত মুছতে পারে, ভয় দূর করতে পারে এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচার পথ দেখায়।

৫.২ “সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না”—বক্তা কে? ‘সে’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? বক্তার ফিরে না আসার কারণ কী?


উত্তরঃ প্রসঙ্গ: পাবলো নেরুদার কবিতা ‘অসুখী একজন’-এ কবি প্রথমে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিচ্ছেদের কথা বলেছেন, পরে ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তিগত বেদনা যুদ্ধ, ধ্বংস ও সভ্যতার সর্বনাশের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। আলোচ্য উক্তিটি কবিতার একেবারে শুরুতেই এসেছে এবং পরবর্তী সমস্ত ঘটনার মানসিক ভিত্তি তৈরি করে।

এই উক্তিটির বক্তা হলেন কবি নিজেই। এখানে ‘সে’ বলতে সেই মেয়েটিকে বোঝানো হয়েছে, যাকে কবি অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে চলে গিয়েছিলেন। মেয়েটি বিশ্বাস করেছিল কবি আবার ফিরে আসবেন, তাই সে অপেক্ষা করে গেছে—দিন, সপ্তাহ, বছর পার হলেও। তার এই অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রেম, বিশ্বাস ও মানবিক আশা।

কবি ফিরে না আসার কারণ প্রথমে ব্যক্তিগত মনে হলেও পরে তা ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ আসে, রক্তপাত ঘটে, শহর ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, আগুনে পুড়ে যায় মানুষের বসতি ও স্মৃতির স্থানগুলো। এই যুদ্ধ শুধু মানুষকে হত্যা করে না, সম্পর্ক, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধের এই ভয়াবহতার মধ্যেই কবির আর ফিরে আসা সম্ভব হয় না।

অতএব, বক্তার না-ফেরা কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং যুদ্ধ ও সময়ের অপ্রতিরোধ্য প্রবাহের ফল। কবি চলে গেলেও মেয়েটি অপেক্ষায় থেকে যায়—এই অপেক্ষাই কবিতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক। এখানে নেরুদা দেখিয়েছেন, যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু মানুষের অপেক্ষা ও ভালোবাসার যন্ত্রণা শেষ করতে পারে না। এই ভাবই কবিতাটিকে গভীর মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে।

৬. কম বেশি ১৫০ টি শব্দে যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৬.১ “আশ্চর্য, সবই আজ অবলুপ্তির পথে”—কোন জিনিস অবলুপ্তির পথে? কীভাবে জিনিসটি অবলুপ্তির পথে গেল আলোচনা করো।

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: নিখিল সরকার রচিত প্রবন্ধ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’-এ লেখক স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের আলোকে কালি–কলমের দীর্ঘ যাত্রা এবং আধুনিক যন্ত্রযুগে তার ক্রমশ বিলুপ্তির বেদনাকে তুলে ধরেছেন। আলোচ্য উক্তিটি এসেছে সেই আক্ষেপের মুহূর্তে, যখন লেখক অনুভব করেন—একসময়কার গর্বের লেখার উপকরণ আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

উক্ত অংশে যে জিনিসটি অবলুপ্তির পথে, তা হলো কালি–কলম নির্ভর হাতে লেখার সংস্কৃতি। এর মধ্যে বাঁশ বা কঞ্চির কলম, নিবের কলম, দোয়াত, ঘরে তৈরি কালি, পালকের কলম—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। শুধু একটি বস্তু নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল লেখার এক ধরনের সাধনা, ধৈর্য, শৈল্পিকতা ও আবেগ।

এই জিনিসটি অবলুপ্তির পথে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসন। প্রথমে ফাউন্টেন পেন ও বলপেন এসে দোয়াত–কলমকে হটিয়ে দেয়। পরে টাইপরাইটার এবং সর্বশেষ কম্পিউটার লেখালেখিকে পুরোপুরি যান্ত্রিক করে তোলে। কিবোর্ড ও স্ক্রিনের যুগে হাতের লেখা, কালির গন্ধ, নিবের আঁচড়—সবই অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হতে শুরু করে। দ্রুততা ও সুবিধার চাপে মানুষ ধীরে ধীরে কলম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ফলে লেখালেখি এখন আর এক ধরনের শিল্প বা অনুশীলন নয়, বরং যান্ত্রিক উৎপাদনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখক এই অবলুপ্তিকে কেবল একটি উপকরণের হারানো হিসেবে দেখেন না, বরং মানবিক স্পর্শ, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ক্ষয় হিসেবেই দেখেন। তাই তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপ—“আহা, সবই আজ অবলুপ্তির পথে”—একটি যুগের অবসানের গভীর বেদনা প্রকাশ করে।

৬.২ “আমাদের আলংকারিকগণ শব্দের বিবিধ কথা বলেছেন”—‘বিবিধ কথা’ কী? তাদের প্রয়োগমূলক দিকগুলি সম্পর্কে প্রবন্ধকারের মত আলোচনা করো।

উত্তরঃ প্রসঙ্গ:
প্রবন্ধকার রাজশেখর বসু ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে বাংলা বৈজ্ঞানিক ভাষার দুর্বলতা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন— “আমাদের আলংকারিকগণ শব্দের বিবিধ কথা বলেছেন”। এই কথার মাধ্যমে তিনি শব্দের অর্থব্যঞ্জনা ও ব্যবহারগত বৈচিত্র্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং বৈজ্ঞানিক রচনায় সেই ‘বিবিধ কথা’-র প্রয়োগ কতটা যুক্তিসংগত, তা ব্যাখ্যা করেছেন।

‘বিবিধ কথা’ কী:
আলংকারিক শাস্ত্র অনুযায়ী শব্দের তিন প্রকার অর্থ বা কথা আছে—

১. অভিধা: শব্দের সরাসরি আভিধানিক অর্থ।
২. লক্ষণী: আভিধানিক অর্থের বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বা ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থ।
৩. ব্যঞ্জনা: শব্দের অন্তর্নিহিত ভাব বা রূপক অর্থ, যা সরাসরি বলা না হলেও বোঝানো হয়।

এই তিনটিকেই একত্রে শব্দের ‘বিবিধ কথা’ বলা হয়েছে।

তাদের প্রয়োগমূলক দিক ও প্রবন্ধকারের মত:
রাজশেখর বসুর মতে, সাধারণ সাহিত্য বা কাব্যে লক্ষণা ও ব্যঞ্জনার ব্যবহার সৌন্দর্য বাড়ালেও বৈজ্ঞানিক রচনায় তা সমস্যাজনক। কারণ বিজ্ঞানচর্চার মূল লক্ষ্য হলো স্পষ্টতা, নির্ভুলতা ও দ্ব্যর্থহীন অর্থ প্রকাশ। এখানে রূপক, অতিশয়োক্তি বা ব্যঞ্জনামূলক ভাষা পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই বৈজ্ঞানিক লেখায় শব্দের অভিধাগত অর্থের ব্যবহারই সর্বাধিক প্রয়োজনীয়। প্রবন্ধকার স্পষ্ট করে বলেছেন— বৈজ্ঞানিক ভাষা যত সরল ও স্পষ্ট হবে, ততই তা কার্যকর হবে।

উপসংহার:
অতএব, ‘বিবিধ কথা’ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি হলেও বৈজ্ঞানিক রচনায় তার সীমিত ও সংযত প্রয়োগই কাম্য। বিজ্ঞানকে বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য করতে শব্দের অলংকার নয়, বরং অর্থের স্পষ্টতাই মুখ্য—এই মতই প্রবন্ধকার জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

৭. কম বেশি ১২৫ টি শব্দে যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৭.১ “তোমাকে আমরা চোখের মুখে উঠিয়ে দিতে পারি,”— কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে?
বক্তার এমন বলার কারণ কী?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-র দরবার দৃশ্যে এই উক্তিটি করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। তিনি এই কথা বলেন তাঁর সিপাহসালার মীরজাফরকে উদ্দেশ্য করে। নাটকের এই অংশে দরবারে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, দেশীয় আমির-ওমরাহদের দ্বিচারিতা এবং বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংকটের মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে।

কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে:
“তোমাকে আমরা চোখের মুখে উঠিয়ে দিতে পারি”—এই উক্তিটি নবাব সিরাজদ্দৌলা তাঁর সেনাপতি মীরজাফরকে উদ্দেশ্য করে বলেন। মীরজাফর তখন দরবারে প্রভাবশালী ব্যক্তি, নবাবের আত্মীয় এবং বাংলার সামরিক শক্তির প্রধান স্তম্ভ।

বক্তার এমন বলার কারণ:
এই উক্তির মধ্য দিয়ে সিরাজ তাঁর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বোঝাতে চান যে, তিনি চাইলে মীরজাফরকে সম্মান, মর্যাদা ও ক্ষমতার শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—এই সম্মান সম্পূর্ণ নবাবের অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। মীরজাফরের প্রতি সিরাজের এই বক্তব্যে একদিকে যেমন বিশ্বাস ও প্রত্যাশার প্রকাশ রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে সতর্কবার্তা। কারণ সিরাজ বুঝতে পারছেন যে দরবারের কিছু লোক ইংরেজদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে রাজদ্রোহে লিপ্ত।

সিরাজ এই উক্তির মাধ্যমে মীরজাফরকে মনে করিয়ে দেন যে তাঁর ক্ষমতা ও অবস্থান নবাবের দান, কাজেই দেশের বিপদের সময়ে তাঁর কর্তব্য বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করা। এই বক্তব্যে সিরাজের আত্মমর্যাদা, শাসকসত্তা এবং অন্তরের আশঙ্কা—তিনটিই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

উপসংহার:
অতএব, “চোখের মুখে উঠিয়ে দেওয়া”-র উক্তিটি কেবল অহংকারের প্রকাশ নয়, বরং এটি বিশ্বাস, হুঁশিয়ারি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত প্রকাশ, যা নাটকে সিরাজের ট্র্যাজিক চরিত্রকে আরও গভীর করে তোলে।

৭.২ “জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী,”— বক্তা কে?
উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তরঃ প্রসঙ্গ: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-র দরবার দৃশ্যে এই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিটি করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। বাংলার স্বাধীনতা যখন চরম সংকটের মুখে, ইংরেজদের ষড়যন্ত্র ও দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের কারণে জাতির ভবিষ্যৎ যখন অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে—ঠিক সেই মুহূর্তে সিরাজ এই কথাটি উচ্চারণ করেন।

বক্তা কে:
“জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী”—এই উক্তিটির বক্তা হলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজউদ্দৌলা।

উক্তিটির তাৎপর্য:
এই উক্তির মাধ্যমে সিরাজ সমগ্র বাংলার রাজনৈতিক ও জাতীয় অবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। ‘সৌভাগ্য-সূর্য’ বলতে তিনি বাংলার স্বাধীনতা, সম্মান, সমৃদ্ধি ও আত্মমর্যাদাকে বোঝাতে চেয়েছেন। সূর্য যেমন আলো ও জীবন দেয়, তেমনি স্বাধীনতা জাতিকে শক্তি ও মর্যাদা প্রদান করে। কিন্তু সেই সূর্য যখন ‘অস্তাচলগামী’, তখন তা অন্ধকার ও বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসন, চক্রান্ত, কলকাতা ও চন্দননগর আক্রমণের ষড়যন্ত্র এবং মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠদের মতো দেশীয় শক্তির বিশ্বাসঘাতকতা—সব মিলিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে। সিরাজ গভীর বেদনায় উপলব্ধি করেন যে, জাতি আজ আত্মবিস্মৃত, বিভক্ত ও দুর্বল; ফলে বিদেশি শক্তির কাছে পরাজয় প্রায় অনিবার্য।

এই উক্তির মধ্যে সিরাজের ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং একজন দেশপ্রেমিক শাসকের অন্তর্দাহ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বুঝতে পারছেন যে তাঁর একার পক্ষে এই সর্বনাশ ঠেকানো কঠিন, কারণ জাতি ঐক্যহীন। তাই এই বাক্যটি নাটকের ট্র্যাজিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে এবং পলাশির পরাজয়ের পূর্বাভাস দেয়।

উপসংহার:
অতএব, “জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী”—এই উক্তিটি বাংলার স্বাধীনতার অবসান, জাতীয় বিপর্যয় এবং ইতিহাসের এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণের প্রতীক। এটি সিরাজউদ্দৌলার অসহায় বেদনা ও দেশপ্রেমের এক অমর প্রকাশ।

৮. কম বেশি ১৫০ টি শব্দে যে কোন দুটি প্রশ্নের উত্তর দাওঃ

৮.১ “এটা বুকের মধ্যে পুষে রাখুক”— কী পুষে রাখার কথা বলা হয়েছে ? কী কারণে এই পুষে রাখা?

উত্তরঃ প্রসঙ্গ:
খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে রচিত মতী নন্দীর উপন্যাস ‘কোনি’-র চিড়িয়াখানা পর্বে ক্ষিতীশ সিংহের উক্তি—“এটা বুকের মধ্যে পুষে রাখুক”—উল্লেখযোগ্য। কোনির সঙ্গে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে গিয়ে ঘটে যাওয়া একটি অপমানজনক ঘটনার প্রেক্ষিতেই এই মন্তব্য করা হয়।

কী পুষে রাখার কথা বলা হয়েছে:
এখানে ‘এটা’ বলতে বোঝানো হয়েছে কোনির মনে সৃষ্ট অপমানবোধজনিত রাগ, ক্ষোভ ও আক্রোশ। চিড়িয়াখানায় খাবার খাওয়ার সময় জল না থাকায় কোনি পাশের স্কুলের ছাত্রীদের কাছে জল চাইতে গেলে এক দিদিমণি তাকে অপমান করে ফিরিয়ে দেন। পরে সেই দলে থাকা হিয়া মিত্র জল দিতে এলে কোনি তার দেওয়া জলের গ্লাস ফেলে দেয় এবং তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এই ঘটনার ফলে কোনির মনে যে অপমানের যন্ত্রণা ও রাগ জমে ওঠে, সেই অনুভূতিটিকেই ‘বুকের মধ্যে পুষে রাখার’ কথা বলা হয়েছে।

কী কারণে এই পুষে রাখা:
ক্ষিতীশ সিংহ জানতেন যে হিয়া মিত্র সাঁতারে দক্ষ এবং ভবিষ্যতে কোনির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চলেছে। তিনি রবীন্দ্র সরোবরের প্রতিযোগিতায় ও বালিগঞ্জ সুইমিং ক্লাবে হিয়ার সাঁতারের কুশলতা স্বচক্ষে দেখেছিলেন। তাই ক্ষিতীশ বুঝেছিলেন—এই অপমান ও আক্রোশ কোনির মন থেকে মুছে দিলে তার লড়াইয়ের তাগিদ কমে যাবে। বরং এই অপমানবোধ যদি কোনি নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারে, তবে তা তাকে আরও কঠোর অনুশীলন, দৃঢ় সংকল্প ও প্রতিযোগিতায় জয়ের জন্য মানসিক শক্তি জোগাবে।

উপসংহার:
অতএব, ক্ষিতীশ সিংহ কোনির আচরণ সমর্থন না করলেও কৌশলগত কারণে তার মনে জন্ম নেওয়া অপমান ও আক্রোশকে দমন করতে চাননি। ভবিষ্যৎ সাফল্যের প্রেরণা হিসেবেই তিনি চেয়েছিলেন—কোনি যেন এই অনুভূতিকে বুকের মধ্যে পুষে রাখে।

৮.২ “তবে আপনার হার্টটা বোধ হয় বেশিদিন এই গন্ধমাদন টানতে পারবে না”—কে, কাকে একথা বলেছিল? বক্তার একথা বলার কারণ কী?

উত্তরঃ বক্তা ও শ্রোতা:
উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র ক্ষিতীশ সিংহ। তিনি এই কথাটি বলেছিলেন বিষ্টুচরণ ধর—সংক্ষেপে যিনি ‘বিষ্টুদা’ নামে পরিচিত—তাঁকে উদ্দেশ্য করে।

বক্তার একথা বলার কারণ:
বিষ্টুচরণ ধর ছিলেন অত্যন্ত স্থূলকায় ও ভারী শরীরের অধিকারী একজন মানুষ। তাঁর ওজন ছিল প্রায় সাড়ে তিন মণ এবং শরীরজুড়ে অতিরিক্ত মেদের আধিক্য ছিল স্পষ্ট। মালিশ করানোর সময় তাঁর শরীরের চর্বি থলথল করে কাঁপছিল, যা ক্ষিতীশের চোখে পড়ে। এই বিশাল, ভারী ও পাহাড়সম শরীরকেই ক্ষিতীশ রূপক অর্থে ‘গন্ধমাদন’ পর্বতের সঙ্গে তুলনা করেন।

বিষ্টু ধর নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের প্রতি একেবারেই সচেতন ছিলেন না। নিয়মিত শরীরচর্চা বা পরিশ্রম না করে তিনি মালিশ করিয়েই শরীরচর্চার ভান করতেন। এই অলস ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন দেখে ক্ষিতীশ বুঝতে পারেন যে, এত বিপুল ওজন ও মেদ হৃদযন্ত্রের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ও বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে ক্ষিতীশ আশঙ্কা করেছিলেন যে, এভাবে চলতে থাকলে বিষ্টু ধরের হার্ট বেশিদিন এই অতিরিক্ত ভার সহ্য করতে পারবে না এবং যে কোনো সময় বড় ধরনের শারীরিক বিপদ ঘটতে পারে।

তাই কিছুটা বিদ্রুপের ছলে, আবার কিছুটা সতর্ক করার উদ্দেশ্যে ক্ষিতীশ সিংহ মন্তব্য করেন— “তবে আপনার হার্টটা বোধ হয় বেশিদিন এই গন্ধমাদন টানতে পারবে না।” এখানে ‘গন্ধমাদন’ বলতে বিষ্টু ধরের স্থূল ও ভারী দেহকেই বোঝানো হয়েছে।

উপসংহার:
এই উক্তির মাধ্যমে ক্ষিতীশ সিংহের বাস্তববোধ, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে লেখক সমাজের সেইসব মানুষের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যারা নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন থেকে শেষ পর্যন্ত মারাত্মক বিপদের মুখে পড়ে।

৮.৩ “ফাইট, কোনি ফাইট”—সাধারণ মেয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠতে গিয়ে কোনিকে কী ধরনের ‘ফাইট’ করতে হয়েছিল? সংক্ষেপে তার পরিচয় দাও।

উত্তরঃ ভূমিকা ও প্রসঙ্গ:
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মতি নন্দীর রচিত ‘কোনি’ উপন্যাসে “ফাইট, কোনি ফাইট” কথাটি নিছক একটি স্লোগান নয়; এটি কোনির জীবনসংগ্রামের মূলমন্ত্র। তার প্রশিক্ষক ক্ষিতীশ সিংহ প্রদত্ত এই মন্ত্রই কোনিকে জীবনের প্রতিটি প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছিল।

কোনিকে যে ধরনের ‘ফাইট’ করতে হয়েছে:

১) দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই:
কোনি ছিল গঙ্গার ঘাটে আম কুড়িয়ে দিন কাটানো এক চরম দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই কমলের সামান্য আয়ে সংসার চলত। কমলের আকস্মিক মৃত্যুর পর সংসারের অভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। আধপেটা খেয়ে কিংবা কাঁচালঙ্কা–মুড়ি খেয়েও কোনিকে তার কঠোর অনুশীলনের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে।

২) মানসিক জেদ ও শারীরিক লড়াই:
উপন্যাসের শুরুতেই গঙ্গার ঘাটে আম কুড়োনোর সময় ছেলেদের সঙ্গে লড়াইয়ে কোনির জেদি ও সংগ্রামী চরিত্র প্রকাশ পায়। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাঁতার কাটা এবং ভাদুর মতো ছেলেদের শারীরিক বাধা অতিক্রম করে নিজের অধিকার আদায় করাই ছিল তার সহজাত ‘ফাইট’। শরীরের ক্লান্তি ও যন্ত্রণা উপেক্ষা করে ক্ষিতীশ সিংহের কঠোর অনুশাসনে নিজেকে গড়ে তোলাই ছিল তার প্রতিদিনের যুদ্ধ।

৩) সামাজিক অবহেলা ও অপমানের বিরুদ্ধে লড়াই:
বস্তিবাসী মেয়ে হওয়ার কারণে কোনিকে তথাকথিত ভদ্রসমাজ ও ধনী ক্লাবগুলোর কাছ থেকে বারবার অবহেলা ও অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তাকে ‘চোর’ অপবাদ দেওয়া হয়েছে, ‘মেয়েমদ্দানি’ বলে বিদ্রুপ করা হয়েছে। কিন্তু কোনি এই সব অপমানের জবাব দিয়েছে তার সাঁতারের অসাধারণ সাফল্যের মাধ্যমে।

৪) প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই:
জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় কোনির বিরুদ্ধে বারবার অন্যায় করা হয়েছে। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে দল থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, মাদ্রাজে প্রতিযোগিতার সময় তাকে বসিয়ে রেখে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। এই নোংরা প্রশাসনিক রাজনীতির বিরুদ্ধে কোনির লড়াই ছিল নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার লড়াই।

৫) হিয়া মিত্র ও নিজের সঙ্গে লড়াই:
ধনী পরিবারের মেয়ে হিয়া মিত্র ছিল কোনির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। হিয়ার প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ ও অপমানকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং নিজের মনের গভীরে সঞ্চিত যন্ত্রণাকে সম্বল করে শেষ ল্যাপে যে ঐতিহাসিক জয় কোনি ছিনিয়ে এনেছিল, সেটিই ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ‘ফাইট’।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, কোনির ‘ফাইট’ ছিল একাধারে দারিদ্র্য, সামাজিক অপমান, প্রশাসনিক অন্যায় এবং নিজের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। বিদ্রুপ ও অবহেলার অন্ধকারে ডুবে না গিয়ে আগুনের মতো জ্বলে উঠে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই “ফাইট, কোনি ফাইট” উক্তিটি সম্পূর্ণ সার্থকতা লাভ করেছে।

৯. চলিত বাংলায় আনুবাদ করঃ

We are living in an age of Science. Science has discovered and invented many things. Electricity is one of the greatest gifts of Science to man. Electricity has almost changed the mode of our life.

আমরা বিজ্ঞানের যুগে বসবাস করছি। বিজ্ঞান বহু জিনিস আবিষ্কার ও উদ্ভাবন করেছে। বিদ্যুৎ হলো বিজ্ঞানের মানুষের প্রতি দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উপহারগুলির মধ্যে একটি। বিদ্যুৎ আমাদের জীবনের ধারা প্রায় সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

১০. কম বেশি ৪০০ শব্দে যে কোন একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করঃ

বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার

ভূমিকা: একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখছি, তখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কুসংস্কারের বিষবাষ্প আমাদের লজ্জিত করে। সভ্যতার উন্নতির মূলে রয়েছে বিজ্ঞান, আর অবনতির মূলে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস। বিজ্ঞানমনস্কতা মানে কেবল বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়া নয়, বরং যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্কতা।

বিজ্ঞানমনস্কতা কী: বিজ্ঞানমনস্কতা হলো একটি মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো বিষয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে তাকে যুক্তি, কার্যকারণ সম্পর্ক এবং প্রমাণের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার নামই বিজ্ঞানমনস্কতা। এটি মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে সত্যের সন্ধান দেয়।

কুসংস্কারের স্বরূপ ও কারণ: কুসংস্কার হলো যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস। আদিম মানুষেরা যখন প্রকৃতির রুদ্ররূপের কারণ বুঝতে পারত না, তখন ভয় থেকে নানা কাল্পনিক দেবদেবী ও আচারের সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের অপপ্রচারে কুসংস্কার আজও টিকে আছে। হাঁচি-টিকটিকি মানা, ডাইনি প্রথা, পাথর বা তাবিজে ভাগ্য বদলের চেষ্টা—এসবই কুসংস্কারের রূপ।

বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কার: বিজ্ঞান ও কুসংস্কার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। বিজ্ঞান চলে যুক্তির পথে, আর কুসংস্কার চলে ভয়ের পথে। বিজ্ঞান মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, অন্যদিকে কুসংস্কার মানুষকে পরনির্ভরশীল ও ভীরু করে রাখে। সমাজের একদল মানুষ যখন বিজ্ঞানের আশীর্বাদ (যেমন: স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট) ভোগ করে আবার সেই মাধ্যমেই অপপ্রচার বা গুজব ছড়ায়, তখন তাকে মানসিক দেউলিয়াপনা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

কুসংস্কারের কুফল: কুসংস্কার সমাজ ও জাতীয় উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায়। চিকিৎসার বদলে ঝাড়ফুঁক বা ওঝার কাছে গিয়ে অকালে প্রাণ হারানো, ডাইনি সন্দেহে মানুষ হত্যা বা জাতিগত বিদ্বেষ—এসবই কুসংস্কারের ভয়াবহ ফল। এটি মানুষের বিচারবুদ্ধি কেড়ে নিয়ে তাকে দাসে পরিণত করে।

প্রতিকার ও আমাদের করণীয়: কুসংস্কার দূর করতে কেবল আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা।

  • শিক্ষা: মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক ও নীতিবোধসম্পন্ন শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।
  • যুক্তিবাদ: ছোটবেলা থেকেই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
  • সাংস্কৃতিক আন্দোলন: পাড়ায় পাড়ায় বিজ্ঞান মঞ্চ ও সেমিনারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।

উপসংহার: বিজ্ঞানমনস্কতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সুস্থ সমাজ গঠনের চাবিকাঠি। কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করতে আমাদের যুক্তির মশাল জ্বালাতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার মেধায় ও মননে। বিজ্ঞানমনস্কতা যখন কুসংস্কারকে পরাজিত করবে, তখনই একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে।

বাংলার উৎসব

ভূমিকা: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ—এই প্রবাদটি বাংলার জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। উৎসব মানেই আনন্দের জোয়ার, মিলন আর ঐক্যের সুর। বাংলার শ্যামল প্রকৃতির বুকে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎসবের যে ধারা বয়ে চলে, তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। উৎসব বাঙালির প্রাণের স্পন্দন।

উৎসবের শ্রেণিবিভাগ: বাংলার উৎসবগুলিকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক উৎসব, ঋতু উৎসব এবং জাতীয় উৎসব।

ধর্মীয় উৎসব: বাংলার প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো ‘শারদীয়া দুর্গাপূজা’। ঢাকের কাঠি আর শিউলি ফুলের গন্ধে শরৎকাল যখন মেতে ওঠে, তখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে উৎসবে সামিল হয়। এছাড়া হিন্দুদের কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতীপূজা এবং ভাইফোঁটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। বড়দিন বা ক্রিসমাস খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও আজ তা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বুদ্ধপূর্ণিমা বা মহাবীর জয়ন্তীও বাংলায় সশ্রদ্ধায় পালিত হয়।

সামাজিক ও লোকজ উৎসব: বাংলার লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সামাজিক উৎসব। জামাইষষ্ঠী, নবান্ন, পৌষ পার্বণ বা পিঠে-পুলির উৎসব বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। গ্রামের মেলাগুলি হলো লোকজ উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। এছাড়া চড়ক, গাজন ও শিবরাত্রির মেলা গ্রামবাংলার চিরাচরিত রূপটিকে ধরে রেখেছে।

ঋতু উৎসব: প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে বাঙালির মনও নেচে ওঠে। বসন্তের আগমনে ‘দোলপূর্ণিমা’ বা ‘বসন্তোৎসব’ রঙের খেলায় মেতে ওঠে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবর্তিত শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব আজ বিশ্বখ্যাত। পহেলা বৈশাখ বা ‘বাংলা নববর্ষ’ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক। হালখাতা আর নতুন পোশাকের গন্ধে বৈশাখী মেলা বাংলার ঘরে ঘরে খুশির আমেজ নিয়ে আসে।

জাতীয় উৎসব: ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস (১৫ই আগস্ট), প্রজাতন্ত্র দিবস (২৬শে জানুয়ারি) এবং গান্ধী জয়ন্তী বাংলার মানুষের কাছে জাতীয় গর্বের দিন। এছাড়া পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রজয়ন্তী এবং শিক্ষক দিবস বাঙালির মননশীল চেতনার উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব: বাংলার উৎসবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়। উৎসবের মেলায় হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে। উৎসব মানুষের মনের সংকীর্ণতা দূর করে, পারস্পরিক ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দেয় এবং সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করে। এটি বাঙালির একতার শক্তিকে বাড়িয়ে তোলে।

উপসংহার: উৎসব কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, এটি মানুষের জীবনের একঘেয়েমি দূর করে নবপ্রাণের সঞ্চার করে। বর্তমানের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে বাংলার এই উৎসবগুলিই আমাদের মানসিক প্রশান্তি জোগায়। তাই উৎসবের আনন্দ যেন কোনো বিকৃত কৃত্রিমতায় হারিয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের নজর রাখা প্রয়োজন। মিলনের এই মহামন্ত্রই হোক বাংলার উৎসবের আসল পরিচয়।

তোমার জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা

ভূমিকা: মানুষের জীবন অসংখ্য ছোট-বড় ঘটনার সমষ্টি। কিছু ঘটনা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়, আবার কিছু ঘটনা স্মৃতির মণিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে থাকে। আমার জীবনেও এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যা আমাকে আনন্দিত করেছে কিংবা নতুন কোনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তেমনই একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হলো আমার প্রথম পাহাড় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। সেই দিনটির কথা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ অনুভব করি এবং চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে হিমালয়ের রূপ।

যাত্রার সূত্রপাত: গত বছর শীতের শুরুতে বাবা-মায়ের সঙ্গে আমি উত্তরবঙ্গের সান্দাকফু যাওয়ার সুযোগ পাই। পাহাড় নিয়ে বইয়ের পাতায় অনেক পড়েছি, কিন্তু চাক্ষুষ দেখার সুযোগ ছিল এটাই প্রথম। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে চড়ে যখন আমাদের যাত্রা শুরু হলো, তখন থেকেই মনের ভেতর এক অজানা উত্তেজনা কাজ করছিল। পরদিন সকালে যখন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামলাম, তখন ভোরের হিমেল হাওয়া আমাদের অভ্যর্থনা জানাল।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত: জলপাইগুড়ি থেকে জিপে করে যখন আমরা ক্রমশ উপরের দিকে উঠছিলাম, তখন চারপাশের দৃশ্য বদলে যেতে শুরু করল। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, পাইন আর ফার গাছের সারি, আর মেঘেদের লুকোচুরি খেলা—সবই ছিল স্বপ্নের মতো। আমরা যখন সান্দাকফুতে পৌঁছালাম, তখন চারপাশ বরফে ঢাকা। পাহাড়ের গায়ে রোদ পড়ে মনে হচ্ছিল যেন সোনার গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রথম আমি মেঘেদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি পেলাম। সেই বিজন পাহাড়ের নির্জনতা আমাকে জীবনের এক গভীর প্রশান্তির স্বাদ দিয়েছিল।

চরম উত্তেজনার মুহূর্ত ও শিক্ষা: আমার এই ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি ছিল ভোরের সূর্যোদয় দেখা। প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে যখন আমরা ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ালাম, তখন চারপাশ ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ দিগন্ত রেখায় দেখা দিল হালকা লাল আভা। একটু পরেই কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে সূর্যের প্রথম আলো পড়ে যেন আগুন জ্বলে উঠল। রূপালি পাহাড় মুহূর্তের মধ্যে কাঞ্চনবর্ণ ধারণ করল। প্রকৃতির এই রুদ্র-সুন্দর রূপ দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, মহাবিশ্বের কাছে আমরা কত ক্ষুদ্র, অথচ আমাদের অহংকার কত বিশাল! পাহাড় আমাকে ধৈর্য এবং সহনশীলতার এক অমোঘ শিক্ষা দিয়েছিল।

স্মরণীয় হওয়ার কারণ: এই অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে স্মরণীয় হওয়ার প্রধান কারণ হলো এটি আমাকে প্রকৃতির অমোঘ শক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে পাহাড়ের কোলে নিজেকে আবিষ্কার করার সেই সুযোগ আমি আগে কখনো পাইনি। এছাড়াও, পাহাড়ি মানুষদের সহজ-সরল জীবনযাপন এবং প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের হাসি আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। সেই ভ্রমণের প্রতিটি ছবি এবং প্রতিটি স্মৃতি আজও আমার অলস দুপুরে মনের জানলা দিয়ে উঁকি দেয়।

উপসংহার: স্মৃতি মানুষের জীবনের সম্পদ। সান্দাকফুর সেই সাতটি দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্যতম। সেই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক কোনো ভ্রমণ ছিল না, তা ছিল এক আত্মিক উপলব্ধি। মানুষের জীবনের এই ধরনের অভিজ্ঞতাই তার মনকে প্রসারিত করে এবং সংকীর্ণতাকে দূর করে। জীবনের পথে চলতে চলতে হয়তো আরও অনেক জায়গায় যাব, কিন্তু প্রথম পাহাড় দেখার সেই শিহরণ চিরকাল আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

একটি বিদ্যালয়ের আত্মকথা

ভূমিকা: আমি একটি সাধারণ অট্টালিকা নই, আমি শত শত প্রাণের স্পন্দন। আমি একটি বিদ্যালয়। ইঁট-কাঠ-পাথরে গড়া আমার শরীর হলেও আমার প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলিতে। আজ বহু বছর পর নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভেবে আমি বড় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছি। আমার চারদিকের দেওয়ালে ঘেরা এই প্রাঙ্গণে কত ইতিহাস জমা হয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।

জন্ম ও শৈশবকাল: আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই অঞ্চলের এক মহানুভব মানুষের হাত ধরে আমার জন্ম হয়েছিল। তখন আমি ছিলাম জীর্ণ এক টালির চালের ঘর। চারিদিকে ছিল জঙ্গল আর জলাভূমি। কিন্তু সেই ধুলোবালির মধ্যেই আমি বড় হয়েছি। মাত্র কয়েকজন শিক্ষক আর একমুঠো ছাত্র নিয়ে আমার পথচলা শুরু হয়েছিল। সেই সময় ব্ল্যাকবোর্ড ছিল না, বেঞ্চ ছিল না; কিন্তু ছিল শেখার এক অদম্য জেদ। আজ আমি বিশাল এক অট্টালিকা, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আমার সেই শৈশবের সরলতাকে আমি আজও ভুলিনি।

কর্মব্যস্ত দিনলিপি: আমার দিন শুরু হয় ভোরের নরম আলোয়। গেট খোলার শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। তারপর শুরু হয় কচিকাঁচাদের পদচারণা। প্রার্থনার সুরে যখন চারপাশ মুখরিত হয়, তখন আমার প্রতিটি ইঁট যেন পবিত্র হয়ে ওঠে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ঘণ্টা পড়ার শব্দ, ব্ল্যাকবোর্ডে খড়ির আওয়াজ আর করিডোরে শিক্ষকদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর—সব মিলিয়ে আমি এক অদ্ভুত আনন্দ উপভোগ করি। টিফিনের সময় খেলার মাঠে ছাত্রছাত্রীদের হুটোপুটি দেখে আমার মনে হয়, আমি আজও এক চিরকিশোরী।

সাফল্য ও গৌরবের ইতিহাস: আমার কোল থেকে কত শিশু বড় হয়ে আজ সমাজের বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা দেশব্রতী শিক্ষক। প্রতি বছর যখন আমার ছাত্রছাত্রীরা ভালো ফল করে বেরিয়ে যায়, তখন গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে। দেওয়ালে টাঙানো মেডেল আর ট্রফিগুলো শুধু ধাতব বস্তু নয়, আমার সন্তানদের পরিশ্রমের ফসল। বড় বড় মনীষীরা যখন আমার প্রাঙ্গণে এসে বক্তৃতা দেন, তখন আমার গরিমা বহুগুণ বেড়ে যায়।

বেদনা ও বিরহের মুহূর্ত: সুখের মাঝেও আমার দুঃখ কম নেই। যখন আমার কোনো প্রিয় ছাত্র বা শিক্ষক চিরতরে বিদায় নেন, তখন আমার এই চার দেওয়াল নিস্তব্ধতায় গুমরে মরে। বিশেষ করে প্রতি বছর শেষ বেলায় যখন দশম বা দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা চোখের জলে আমাকে বিদায় জানিয়ে চলে যায়, তখন আমি বড় একা হয়ে পড়ি। বৃষ্টির দিনে যখন আমার ছাদ থেকে চুঁইয়ে জল পড়ে, কিংবা ছুটির লম্বা অবসরে যখন নিস্তব্ধতা গ্রাস করে, তখন আমি খুব বিষণ্ণ বোধ করি।

উপসংহার: যুগ পাল্টেছে, ব্ল্যাকবোর্ডের জায়গায় এসেছে স্মার্টবোর্ড, খাতা-কলমের জায়গা নিচ্ছে ল্যাপটপ। কিন্তু আমার আদর্শ আজও অটুট। আমি চাই অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে। যতদিন পৃথিবীতে সভ্যতা টিকে থাকবে, ততদিন আমি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকব। আমি এক প্রজন্মকে তৈরি করে পাঠিয়ে দেব অন্য এক উন্নত পৃথিবীর পথে। আমার এই আত্মকথা আসলে সমাজ গড়ার এক নীরব সংগ্রামের কথা।

📢 গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

আমাদের লক্ষ্য সবসময় শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক ও নির্ভুল তথ্য প্রদান করা। তবুও অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল হয়ে গেলে, আমরা চাই সেটি যেন দ্রুত সংশোধন করা হয়।

যদি উপরের পোস্টটিতে কোনো ভুল বা অসঙ্গতি খুঁজে পান, অনুগ্রহ করে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার সহযোগিতা আমাদের জন্য অমূল্য — কারণ আমরা চাই না কোনো শিক্ষার্থী ভুল শিখুক।

মনে রাখবেন: আপনার দেওয়া ছোট্ট একটি মন্তব্য অনেকের শেখার পথ সঠিক রাখতে সাহায্য করবে।

Shares:

Related Posts

Higher-Secondary-History-Question-Paper-PDF-2023
Class 12

Higher Secondary History Question Paper PDF 2023 | উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্র PDF 2023

এই নিবন্ধে আমরা জানবো 2023 সালের উচ্চমাধ্যমিকের ইতিহাস প্রশ্নগুলি সম্পর্কে। আশা করি তোমরা যারা এই বছর উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষা দিলে তাদের পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। Notekoro.com -এর পক্ষ থেকে 2023
class-10-physical-science-chapter-08-mcq-answer
Class 10

Class 10 Physical Science Chapter 08 MCQ Answer | মাধ্যমিক ভৌত বিজ্ঞান অধ্যায় ০৮ – ভাগ-২ রাসায়নিক সমীকরণ প্রশ্ন ও উত্তর

এই নিবন্ধে আমরা মাধ্যমিক ভৌত বিজ্ঞান এর অষ্টম অধ্যায় অর্থাৎ রাসায়নিক সমীকরণ এর বেশ কিছু অতি সংক্ষিপ্ত, সংক্ষিপ্ত, দীর্ঘ প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে জানবো। Class 10 Physical Science Chapter 8 MCQ
wbbse-class-10-geography-short-question-answer
Class 10

Class 10 Geography Chapter 01 Very Short Question Answer

১. বহির্জাত প্রক্রিয়া সাধনের মূল উৎস কি?উত্তরঃ- সৌরশক্তি২. পর্যায়ন এর ভাগ দুটি কি কি?উত্তরঃ- অবরোহন ও আরোহন৩. মাটির মধ্যে জমে থাকা বরফসহ জলের ভান্ডার কে কি বলে?উত্তরঃ- বারিমন্ডল৪. জলচক্রের গুরুত্বপূর্ণ
west-bengal-madhyamik-class-10th-bengali-question-paper-2023
Class 10

West Bengal Madhyamik (Class 10th) Bengali Question Paper 2023 | মাধ্যমিক দশম শ্রেণীর বাংলা প্রশ্নপত্র ২০২৩

এই নিবন্ধে আমরা মাধ্যমিক (দশম) শ্রেণির ২০২৩ সালের বাংলা প্রশ্ন সম্পর্কে জানবো। West Bengal Madhyamik (Class 10th) Bengali Question Paper 2023 West Bengal Madhyamik (Class 10th) Bengali Question Paper 2023

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *