Madhyamik 2026 History Question Paper Solution
মাধ্যামিক ২০২৬ পরীক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সম্পূর্ণ সমাধান এখানে দেওয়া হলো। এই পোস্টে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি বিভাগের উত্তর সহজ ও স্পষ্ট বাংলা ভাষায় ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা, বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন এবং সংক্ষিপ্ত উত্তরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ইতিহাস বিষয়ে দৃঢ় প্রস্তুতি নিতে পারবে।
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখঃ
১.১ “লেটারর্স ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার”- গ্রন্থে মোট চিঠির সংখ্যা কটি?
১.২ ‘জীবন স্মৃতি’ গ্রন্থটি লিখেছেন—
১.৩ রামমোহন রায় ‘ব্রহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন—
১.৪ ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন—
১.৫ কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়—
১.৬ ভারতে প্রথম ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রণীত হয়—
১.৭ গয়ামুণ্ডা অন্যতম নেতা ছিলেন—
১.৮ উনিশ শতককে ‘সভা সমিতির যুগ’ বলেছেন—
১.৯ ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতটি রচিত হয়—
১.১০ ‘ভারত সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়—
১.১১ ‘বসুবিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন—
১.১২ ভারতে ‘হাফটোন প্রিন্টিং’ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন—
১.১৩ নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন—
১.১৪ বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন হয়েছিল—
১.১৫ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন—
১.১৬ দু-কড়ি বালা দেবী যুক্ত ছিলেন—
১.১৭ কনকলতা বড়ুয়া শহীদ হন—
১.১৮ দলিতদের ‘হরিজন’ আখ্যা দিয়েছিলেন—
১.১৯ ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়া দখল করেন—
১.২০ হরি সিং রাজা ছিলেন—
২. যেকোনো ১৬ টি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
একটি বাক্যে উত্তর দাওঃ
(২.১.১) ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?
(২.১.২) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কত খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন?
(২.১.৩) ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ কবে শুরু হয়?
(২.১.৪) ‘মতূয়া’ ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
ঠিক না ভুল নির্ণয় করঃ
(২.২.১) বিপিনচন্দ্র পালের জীবনীমূলক গ্রন্থের নাম ‘সত্তর বৎসর’।
বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনীর নাম ‘সত্তর বৎসর’।
(২.২.২) প্রথম ভারতীয় শব ব্যবচ্ছেদকারী হলেন মধুসূদন দত্ত।
প্রথম ভারতীয় শব ব্যবচ্ছেদকারী ছিলেন পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত।
(২.২.৩) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন ব্যঙ্গ চিত্রশিল্পী।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যঙ্গচিত্র ও কার্টুন অঙ্কনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।
(২.২.৪) জাতীয় শিক্ষা-পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে।
জাতীয় শিক্ষা-পরিষদ ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাওঃ
| ক স্তম্ভ | খ স্তম্ভ |
|---|---|
| (২.৩.১) বল্লভভাই প্যাটেল | (৪) বারদোলি আন্দোলন |
| (২.৩.২) ডঃ বি. আর. আম্বেদকর | (৩) দলিত আন্দোলন |
| (২.৩.৩) রশিদ আলি | (২) ছাত্র আন্দোলন |
| (২.৩.৪) মেজর জেনারেল জে.এফ. চৌধুরী | (১) হায়দরাবাদ |
প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখামানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থান গুলি চিনহিত করঃ
| প্রশ্ন | উত্তর |
|---|---|
| (২.৪.১) ওয়াহাবি আন্দোলনের কেন্দ্র | বারাণসী |
| (২.৪.২) কোলবিদ্রোহের কেন্দ্র | রাঁচি |
| (২.৪.৩) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র | ঝাঁসি |
| (২.৪.৪) মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র | দিল্লি |
(কেবলমাত্র দৃষ্টিহিন পরীক্ষার্থীদের জন্য)
শূন্যস্থান পুরন করঃ
(২.৪.১) সরলাদেবী চৌধুরাণীর আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম __________ ।
(২.৪.২) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় __________ খ্রিস্টাব্দে।
(২.৪.৩) সিধু মুর্মু ছিলেন ___________ বিদ্রোহের অন্যতম নেতা।
(২.৪.৪) সাঁওতাল বিদ্রোহের একজন নেতা ছিলেন ___________ ।
নিম্নলিখিত বিবৃতির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যা টি নির্বাচন করঃ
বিবৃতি : এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে স্যার চার্লস উডের শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশনামাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাখ্যা :
(১) তিনি ছিলেন কাউন্সিল অব এডুকেশনের সভাপতি।
(২) তিনি ছিলেন কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি।
(৩) তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী।
বিবৃতি : ভারতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করেছিলেন।
ব্যাখ্যা :
(১) এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসীদের মঙ্গল সাধন করা।
(২) এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।
(৩) এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করা।
বিবৃতি : আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন এদেশে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ।
ব্যাখ্যা :
(১) তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা।
(২) তিনি ছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয়।
(৩) তিনি ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস-এর প্রতিষ্ঠাতা।
বিবৃতি : মোপলা বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে।
ব্যাখ্যা :
(১) এটি ছিল শিল্প শ্রমিকের বিদ্রোহ।
(২) এটি ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ।
(৩) এটি ছিল একটি উপজাতীয় বিদ্রোহ।
৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিন্মলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাওঃ
৩.১ আধুনিক ভারত ইতিহাসের উপাদানরূপে সরকারি নথিপত্রের সীমাবদ্ধতাগুলি কী?
৩.২ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
৩.৩ এদেশে শিক্ষা বিস্তারে ইংরেজ শাসকদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
৩.৪ ‘স্বদেশ সমবায়’ বলতে কী বোঝায়?
৩.৫ ‘বিশ্ব’ বলতে কী বোঝায়?
৩.৬ ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হল কেন?
৩.৭ ‘হিন্দু মেলা’ প্রতিষ্ঠার দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
৩.৮ জাতীয়তাবাদের উত্থানে সংবাদপত্রের কী ভূমিকা ছিল?
৩.৯ পঞ্চানন কর্মকার কে ছিলেন?
৩.১০ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
৩.১১ স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার কারখানাগুলি কেন যোগ দেয়নি?
৩.১২ ওয়ার্কস অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি কেন গঠিত হয়?
৩.১৩ কালচারাল ন্যাশনালিজম বলতে কী বোঝায়?
৩.১৪ দলিত কাদের বলা হয়?
৩.১৫ ভারতবর্ষের দলিত বলতে কী বোঝায়?
৩.১৬ রাজ্যপুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়?
৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিন্মলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাওঃ
(প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত একটি করে মোট ৬ টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
৪.১ উনিশ শতকে নবজাগরণ সামাজিক সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
ব্রিটিশ সরকারও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সংস্কারে আন্তরিক ছিল না, কারণ তারা শাসনব্যবস্থার স্থিতি রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী ছিল। নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের মতো সংস্কার সমাজের একাংশ মেনে নিলেও বৃহৎ সমাজ তা গ্রহণ করেনি। এই সব কারণে উনিশ শতকের নবজাগরণের সামাজিক সংস্কার প্রচেষ্টা আংশিক সাফল্য পেলেও সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ বলে বিবেচিত হয়।
৪.২ উনিশ শতকের নবজাগরণকে ‘সীমাবদ্ধ নবজাগরণ’ বলা হয় কেন?
এই নবজাগরণে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবধারার প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি, ফলে ভারতীয় সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়েছে। নারী মুক্তি ও সামাজিক সাম্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে নারীরা সমাজে সমান অধিকার পায়নি।
এছাড়া এই আন্দোলন রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে ততটা সক্রিয় ছিল না। ফলে সমাজের সামগ্রিক রূপান্তরের বদলে এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি ও অঞ্চলের মধ্যেই আবদ্ধ থেকে যায়। এই সমস্ত সীমাবদ্ধতার কারণেই উনিশ শতকের নবজাগরণকে ‘সীমাবদ্ধ নবজাগরণ’ বলা হয়।
৪.৩ উনিশ শতককে ‘সভা সমিতির যুগ’ বলা হয় কেন?
এছাড়া জাতীয়তাবাদের বিকাশেও এই সংগঠনগুলির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করার জন্য সভা, বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হত। এই কারণে উনিশ শতককে যথার্থভাবেই ‘সভা সমিতির যুগ’ বলা হয়।
৪.৪ বঙ্গভাষা প্রকাশের শতককে প্রথম রাজনৈতিক জাগরণের শতক বলা হয় কেন?
বাংলা ভাষায় লেখা হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই বক্তব্য সহজে বুঝতে পারে এবং জাতীয় চেতনা গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক আলোচনা এতদিন ইংরেজি ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা মাতৃভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশ রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এই কারণেই বঙ্গভাষা প্রকাশের শতককে প্রথম রাজনৈতিক জাগরণের শতক বলা হয়।
৪.৭ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজের কী ভূমিকা ছিল?
অনেক ছাত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গোপন সমিতি গঠন করে। ছাত্র সমাজের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করে। এই কারণে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়।
৪.৮ দলিত আন্দোলনে ডঃ আম্বেদকরের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
তিনি দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবি তোলেন এবং পুনা চুক্তির মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত করেন। ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে তিনি দলিতদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেন। তিনি শিক্ষাকে দলিত মুক্তির প্রধান অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এই সব কারণে দলিত আন্দোলনে ডঃ আম্বেদকরের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী।
৩. ১৫ – ১৬ টি বাক্যে নিন্মলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাওঃ
৫.১ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা :
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ছিল ভারতের ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের হাত ধরে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ দ্রুত উত্তর ও মধ্য ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। এর চরিত্র বা প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও, এটি যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল—তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
১. সিপাহি বিদ্রোহ বনাম সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া
স্যার জন লরেন্স ও জন সিলি একে কেবল একটি ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁদের মতে, এটি ছিল কেবল স্বার্থান্বেষী সিপাহিদের একটি বিশৃঙ্খলা। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার একে ‘ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত শ্রেণির শেষ আর্তনাদ’ বা একটি সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন, কারণ বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষ্মীবাই বা নানা সাহেবের মতো ক্ষুব্ধ রাজন্যবর্গ।
২. ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম
বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, সিপাহিরা উপলক্ষ মাত্র হলেও এর মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি লাভ। অনেক মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিকও একে বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ হিসেবে দেখেন।
৩. গণবিদ্রোহ ও জনভিত্তি
বিদ্রোহটি কেবল সিপাহিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অযোধ্যা, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের সাধারণ কৃষক, কারিগর এবং তালুকদাররা এতে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক নর্টন দেখিয়েছেন যে, বিদ্রোহের সময় বহু জায়গায় সাধারণ মানুষ বিচারালয় ও থানা আক্রমণ করেছিল, যা একে একটি ‘গণবিদ্রোহ’-এর রূপ দান করে।
৪. হিন্দু-মুসলিম ঐক্য
এই বিদ্রোহের একটি অনন্য চরিত্র ছিল হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের অভূতপূর্ব ঐক্য। বিদ্রোহীরা দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। ব্রিটিশদের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি এখানে সাময়িকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
৫. সীমাবদ্ধতা ও জাতীয়তাবাদের অভাব
আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, এই বিদ্রোহে আধুনিক জাতীয়তাবাদের অভাব ছিল। বিদ্রোহীদের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা রাজনৈতিক আদর্শ ছিল না। তাঁরা মূলত নিজ নিজ এলাকা বা স্বার্থ রক্ষার জন্য লড়েছিলেন। শিখ ও গোর্খা রেজিমেন্ট এবং শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ১৮৫৭-র বিদ্রোহের চরিত্র মিশ্র। এটি শুরু হয়েছিল সিপাহিদের মাধ্যমে, কিন্তু শীঘ্রই তা ব্যাপক জনভিত্তি লাভ করে গণবিদ্রোহের রূপ নেয়। ডঃ এস. এন. সেন-এর মতে, “এটি শুরু হয়েছিল ধর্মের লড়াই হিসেবে, শেষ হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে।” আধুনিক ভারতের মুক্তি সংগ্রামের বীজ এই মহাবিদ্রোহের মধ্যেই উপ্ত ছিল।
৫.২ এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ার এবং ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের ভূমিকা আলোচনা করো।
ভূমিকা :
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ছিল একটি প্রধান স্তম্ভ। এই শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে যে কজন ইউরোপীয় ভারতপ্রেমী নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে ডেভিড হেয়ার এবং জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার
১. পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ার (David Hare)
পেশায় ঘড়ি নির্মাতা হলেও ডেভিড হেয়ার ছিলেন মানবতাবাদী ও শিক্ষা অনুরাগী। তাঁর অবদানসমূহ হলো:
হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮১৭): পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে রাজা রামমোহন রায় ও রাধাকান্ত দেবের সহযোগিতায় তিনি কলকাতায় ‘হিন্দু কলেজ’ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল এশিয়ায় আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রথম প্রধান কেন্দ্র।
স্কুল বুক সোসাইটি (১৮১৭): শিক্ষার্থীদের হাতে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার জন্য তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ গঠন করেন।
স্কুল সোসাইটি (১৮১৮): প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও নতুন স্কুল তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রায় ৩০টি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
অন্যান্য অবদান: তিনি চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার প্রসারে ‘ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সেবার জন্য তাঁকে ‘বাংলার আধুনিক শিক্ষার জনক’ হিসেবে অনেকে অভিহিত করেন।
২. নারীশিক্ষা বিস্তারে ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন (J.E.D. Bethune)
কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সভাপতি জে. ই. ডি. বেথুন সাহেব মূলত নারীশিক্ষার প্রসারে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তাঁর অবদানসমূহ হলো:
বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা (১৮৪৯): রক্ষণশীল সমাজে যখন নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল, তখন তিনি দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগিতায় কলকাতায় ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (বর্তমানে বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন।
সামাজিক সংস্কার: তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারীদের শিক্ষিত না করলে সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। তাঁর স্কুলে কোনো বেতন নেওয়া হতো না এবং পাঠ্যক্রমে কেবল ভাষা নয়, বরং গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ব্যক্তিগত ত্যাগ: বেথুন সাহেব তাঁর ব্যক্তিগত উপার্জনের বড় একটি অংশ এই স্কুলের জন্য দান করে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বিদ্যাসাগর মহাশয় এই স্কুলের সম্পাদক হিসেবে তাঁর কাজ এগিয়ে নিয়ে যান।
৩. শিক্ষার প্রসারে যৌথ প্রভাব
ডেভিড হেয়ার এবং বেথুন সাহেবের প্রচেষ্টায় বাংলার সমাজে একটি নতুন শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। হেয়ার সাহেব যেখানে ছেলেদের জন্য আধুনিক শিক্ষার দ্বার খুলে দিয়েছিলেন, বেথুন সাহেব সেখানে পর্দার আড়ালে থাকা মেয়েদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসেন। তাঁদের হাত ধরেই বাংলায় প্রগতিশীল চিন্তার প্রসার ঘটে।
উপসংহার :
পরিশেষে বলা যায়, ডেভিড হেয়ার ও ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন বিদেশি হয়েও এদেশের মানুষের কল্যাণে যে আত্মত্যাগ করেছেন তা অবিস্মরণীয়। তাঁদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই পরবর্তীকালে বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূতরা উঠে এসেছিলেন। আজীবন কর্মের মাধ্যমে তাঁরা বাঙালির হৃদয়ে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন।
৫.৩ উনিশ শতকে কৃষক আন্দোলনে বাবারা রামচন্দ্রের ভূমিকা কী ছিল? একটি আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
ভূমিকা :
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশ শতকের কুড়ির দশকে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় যে কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বাবা রামচন্দ্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন কৃষকরা জমিদার ও তালুকদারদের চরম শোষণে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন তিনি তাঁদের সংগঠিত করে এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১. বাবা রামচন্দ্রের উত্থান ও সংগঠন
বাবা রামচন্দ্র ছিলেন মহারাষ্ট্রের একজন ব্রাহ্মণ, যিনি ফিজিতে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পর ভারতে ফিরে আসেন। তিনি সন্ন্যাসীর বেশে উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের মধ্যে বিচরণ করতেন এবং রামচরিতমানস পাঠের মাধ্যমে সাধারণ কৃষকদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতেন। তাঁর মূল কৃতিত্ব ছিল বিচ্ছিন্ন কৃষকদের একটি রাজনৈতিক শক্তিরূপে সংগঠিত করা।
২. অবোধ কিষাণ সভা প্রতিষ্ঠা
কৃষকদের দাবিদাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে ১৯২০ সালের অক্টোবর মাসে বাবা রামচন্দ্র জওহরলাল নেহরু ও বাবা রামচন্দ্রের উদ্যোগে ‘অবোধ কিষাণ সভা’ (Oudh Kisan Sabha) প্রতিষ্ঠিত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এর কয়েকশ শাখা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল ভারতের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী সংগঠন।
৩. আন্দোলনের দাবি ও কার্যপদ্ধতি
বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কৃষকরা মূলত তিনটি প্রধান দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু করেন:
- অতিরিক্ত খাজনা আদায় বন্ধ করা।
- ‘বেগার’ শ্রম বা বিনা মজুরিতে কাজ করানো বন্ধ করা।
- জমিদারদের দ্বারা অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ (Bedakhli) বন্ধ করা। তিনি কৃষকদের পরামর্শ দিতেন যাতে তাঁরা জমিদারদের জমিতে কাজ না করেন এবং সামাজিক বয়কটের (নাপিত-ধোপা বন্ধ) মাধ্যমে শোষকদের কোণঠাসা করেন।
৪. একটি আন্দোলনের বিবরণ: অযোধ্যা কৃষক বিদ্রোহ (১৯২০-২১)
১৯২০ সালের শেষদিকে এবং ১৯২১ সালের শুরুতে বাবা রামচন্দ্রের ডাকে এই আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিতে শুরু করে।
বিক্ষোভের রূপ: প্রতাপগড়, রায়বেরিলি ও ফৈজাবাদ জেলায় কৃষকরা জমিদারদের শস্যগোলা লুণ্ঠন করে এবং মহাজনদের ঋণের দলিল পুড়িয়ে দেয়। অনেক জায়গায় কৃষকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে।
ধর্মীয় প্রভাব: বাবা রামচন্দ্র কৃষকদের ‘সীতা-রাম’ স্লোগানে উদ্বুদ্ধ করতেন, যা তাঁদের মধ্যে এক বিশাল আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করেছিল।
৫. সীমাবদ্ধতা ও দমন
ব্রিটিশ সরকার বাবা রামচন্দ্রকে গ্রেফতার করলে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়। তবে আন্দোলনের চাপে সরকার ১৯২১ সালে ‘অযোধ্যা খাজনা আইন’ (Oudh Rent Act) পাশ করতে বাধ্য হয়, যা কৃষকদের উচ্ছেদ হওয়ার হাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। যদিও এই আন্দোলনে আধুনিক জাতীয়তাবাদের পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি, তবুও এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাধারণ কৃষকদের যুক্ত করার পথ প্রশস্ত করেছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বাবা রামচন্দ্র কেবল একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন প্রান্তিক কৃষকদের কণ্ঠস্বর। তাঁর নেতৃত্বেই প্রথমবার উত্তর ভারতের গ্রামীন সমাজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বুক বেঁধে দাঁড়াতে শিখেছিল।
আমাদের লক্ষ্য সবসময় শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক ও নির্ভুল তথ্য প্রদান করা। তবুও অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল হয়ে গেলে, আমরা চাই সেটি যেন দ্রুত সংশোধন করা হয়।
যদি উপরের পোস্টটিতে কোনো ভুল বা অসঙ্গতি খুঁজে পান, অনুগ্রহ করে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার সহযোগিতা আমাদের জন্য অমূল্য — কারণ আমরা চাই না কোনো শিক্ষার্থী ভুল শিখুক।
মনে রাখবেন: আপনার দেওয়া ছোট্ট একটি মন্তব্য অনেকের শেখার পথ সঠিক রাখতে সাহায্য করবে।


