Class 12 Semester 4 History Question Paper with Solution PDF 2025-26
উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণীর চতুর্থ সেমিস্টারের ইতিহাস প্রশ্নপত্র উত্তরসহ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য এখানে PDF আকারে দেওয়া হলো। এই পোস্টে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও সহজবোধ্য উত্তর উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের উত্তর মিলিয়ে নিতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে করতে পারে। Class 12 Semester 4 History Question Paper with Solution PDF 2025-26 দ্রুত পুনরাবৃত্তি ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
১. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) ১৮৫৭ খ্রীঃ মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।
১. স্বত্ববিলোপ নীতি: লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত স্বত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে দত্তকপুত্রের উত্তরাধিকার অস্বীকার করে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর প্রভৃতি দেশীয় রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২. অযোধ্যা দখল: ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কুশাসনের অজুহাতে ব্রিটিশরা অযোধ্যা দখল করে। এর ফলে নবাব, তালুকদার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
৩. দেশীয় রাজাদের ক্ষমতাচ্যুতি: ব্রিটিশদের সম্প্রসারণবাদী নীতির ফলে বহু দেশীয় রাজা ও শাসক তাঁদের রাজ্য, ক্ষমতা ও মর্যাদা হারান। ফলে তাঁরা ব্রিটিশবিরোধী হয়ে ওঠেন।
৪. মুঘল সম্রাটের মর্যাদা হ্রাস: ব্রিটিশ সরকার মুঘল সম্রাটের মর্যাদা ও অধিকার ক্রমশ হ্রাস করে। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাহাদুর শাহ জাফরের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা দিল্লির লালকেল্লায় বসবাস করতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫. পেশোয়ার পরিবারে অসন্তোষ: পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তকপুত্র নানা সাহেবের পেনশন বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁর মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
অতএব, ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী ও দখলদারি নীতির ফলে দেশীয় রাজা, জমিদার, তালুকদার ও অন্যান্য অভিজাত শ্রেণির মধ্যে যে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের অন্যতম প্রধান পটভূমি তৈরি করে।
B) ১৮৫৭ খ্রীঃ মহাবিদ্রোহের পশ্চাতে অর্থনৈতিক কারণগুলি কিরূপ ছিল?
১. কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত রাজস্বের বোঝা: ব্রিটিশ সরকার কৃষকদের কাছ থেকে অত্যধিক হারে ভূমিরাজস্ব আদায় করত। রাজস্ব দিতে না পেরে বহু কৃষক ঋণগ্রস্ত ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।
২. দেশীয় শিল্পের ধ্বংস: ব্রিটিশ শিল্পজাত সস্তা পণ্যের অবাধ আমদানির ফলে ভারতের কুটির ও হস্তশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। বহু কারিগর জীবিকা হারায়।
৩. জমিদার ও তালুকদারদের ক্ষতি: ব্রিটিশদের ভূমি-রাজস্ব নীতি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে বহু জমিদার ও তালুকদার তাঁদের জমি ও অধিকার হারান।
৪. সম্পদের নিষ্কাশন: ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতের বিপুল সম্পদ বিভিন্ন উপায়ে ইংল্যান্ডে চলে যেত। এর ফলে ভারতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫. বেকারত্ব ও দারিদ্র্য: দেশীয় শিল্পের পতন এবং ব্রিটিশ অর্থনৈতিক শোষণের ফলে ব্যাপক বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়।
অতএব, ব্রিটিশদের শোষণমূলক ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা, দেশীয় শিল্পের ধ্বংস এবং ভারতের সম্পদ বিদেশে নিয়ে যাওয়ার নীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অর্থনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, যা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
২. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) আলিগড় আন্দোলনের দুটি উদ্দেশ্য আলোচনা করো। এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
আলিগড় আন্দোলনের দুটি উদ্দেশ্য:
১. আধুনিক শিক্ষার প্রসার: ভারতীয় মুসলিম সমাজের মধ্যে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানো ছিল এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
২. সামাজিক সংস্কার: মুসলিম সমাজের কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতা দূর করে তাদের সামাজিক ও বৌদ্ধিক উন্নতি সাধন করা ছিল এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
B) কখন এবং কেন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ তৈরী হয়েছিল? (মান: ১+২)
কেন: মুসলিমদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুসলিমদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল। এছাড়া, মুসলিমদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জোরদার করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
৩. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) গণপরিষদের উদ্দেশ্য কী ছিল?
গণপরিষদের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনা: গণপরিষদের প্রাথমিক ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন, সার্বভৌম ভারতের জন্য একটি সুসংহত, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংবিধান রচনা করা।
২. নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিতকরণ: ভারতের সমস্ত নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচার এবং বাক-স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার আইনি রূপরেখা তৈরি করা।
৩. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা: সংবিধান রচনার পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের পর থেকে দেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন (১৯৫১-৫২) না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন আইনসভা হিসেবে দেশ পরিচালনা করা।
৪. পদ্ধতিগত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা: এককেন্দ্রীক ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য রেখে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামো এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা।
সংক্ষেপে, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সাধারণতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার মূল রূপরেখা প্রস্তুত করাই ছিল গণপরিষদের মূল উদ্দেশ্য।
B) ভারতের সংবিধানের যে-কোনো দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
১. বিশ্বের দীর্ঘতম ও লিখিত সংবিধান: ভারতের সংবিধান হলো বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ এবং বিস্তারিত লিখিত সংবিধান। এতে দেশের শাসনব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, নির্দেশাত্মক নীতি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক কাঠামোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
২. নমনীয়তা ও অনমনীয়তার অপূর্ব মিশ্রণ: ভারতীয় সংবিধান পুরোপুরি কঠোর বা অনমনীয় নয়, আবার পুরোপুরি সহজ বা নমনীয়ও নয়। জাতীয় প্রয়োজন ও পরিস্থিতির তাগিদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যেমন কিছু ধারা সংশোধন করা যায় (নমনীয়), তেমনই সংবিধানের মূল কাঠামো ও গুরুত্বপূর্ন নীতিগুলি পরিবর্তনের জন্য বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজ্যগুলির সম্মতির প্রয়োজন হয় (অনমনীয়)।
৪. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৫১-৫৬ খ্রীঃ) লক্ষ্য কী ছিল?
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. কৃষি খাতের উন্নয়ন: দেশের তীব্র খাদ্যসংকট দূর করা এবং কাঁচামালের যোগান সুনিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২. সেচ ও নদী উপত্যকা প্রকল্প: কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য ভাকরা-নাঙ্গাল, দামোদর উপত্যকা (DVC) এবং হীরাকুদের মতো বৃহৎ বহুমুখী নদী উপত্যকা প্রকল্প গড়ে তোলা।
৩. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসন: দেশভাগের পর পাকিস্তান থেকে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন প্রদান করা এবং মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা।
৪. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ: পণ্য ও যাত্রী চলাচলের সুবিধার্থে রেলপথ, সড়কপথ ও অন্যান্য পরিকাঠামোগত যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার ও প্রসার ঘটানো।
৫. জাতীয় আয় বৃদ্ধি: জাতীয় আয় ও জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা।
সংক্ষেপে, দেশের ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করে একটি সুদৃঢ় ও স্বনির্ভর কৃষিনির্ভর বুনিয়াদ তৈরি করাই ছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
B) ‘পঞ্চশীল’ নীতির পাঁচটি শর্ত কী ছিল?
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য গৃহীত পঞ্চশীল নীতির পাঁচটি শর্ত নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. পরস্পরের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা: চুক্তিবদ্ধ দেশসমূহ একে অপরের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে।
২. পারস্পরিক অনাগ্রাসন: কোনো দেশই অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন বা আক্রমণ পরিচালনা করবে না।
৩. অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনারোপ বা অনভ্যন্তরীন হস্তক্ষেপ: এক দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নীতি ও বিষয়ে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না।
৪. সমতা ও পারস্পরিক সুবিধা: পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে সব দেশকে সমান মর্যাদা প্রদান করা হবে এবং উভয় দেশের স্বার্থে যৌথ সুবিধার নীতি অনুসরণ করা হবে।
৫. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান: মতাদর্শ বা শাসনব্যবস্থার ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সব রাষ্ট্র পারস্পরিক শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে।
৫. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ ১৮৫৭ খ্রীঃ মহাবিদ্রোহে কেন সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন?
লক্ষ্মীবাঈয়ের মহাবিদ্রোহে যোগদানের প্রধান কারণসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. স্বত্ববিলোপ নীতি ও রাজ্য গ্রাস: ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাও মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আনন্দ রাও নামক এক বালককে দত্তক নেন (যার নাম রাখা হয় দামোদর রাও)। কিন্তু লর্ড ডালহৌসি সাম্রাজ্যবাদী ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করে এই দত্তক পুত্রকে অসিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং ঝাঁসি রাজ্যটিকে বেআইনিভাবে ইংরেজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
২. রানীর অধিকার ও ভাতা বাতিল: রাজ্য কেড়ে নেওয়ার পর রানী লক্ষ্মীবাঈকে রাজপ্রাসাদ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তাঁর জন্য বার্ষিক মাত্র ৬০ হাজার টাকা পেনশন ধার্য করা হয়। এ ছাড়া রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও গচ্ছিত অর্থ দত্তক পুত্রকে দিতে অস্বীকার করে তা ইংরেজ রাজকোষে বাজেয়াপ্ত করা হয়।
৩. প্রজাসাধারণের অসন্তোষ ও ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ: ইংরেজ প্রশাসন ঝাঁসির শাসনভার হাতে নেওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলির অনুদান বন্ধ করে দেয় এবং গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এতে স্থানীয় হিন্দু সমাজ ও সৈন্যদের মধ্যে তীব্র ধর্মীয় অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
৪. দেশপ্রেম ও সামরিক বাধ্যবাধকতা: ১৮৫৭ সালে মিরাট ও দিল্লির বিদ্রোহের খবর ঝাঁসিতে পৌঁছালে সেখানকার সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই সংকটময় মুহূর্তে ঝাঁসির সিপাহি ও প্রজারা রানীকে তাঁদের নেতৃত্ব গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা ও প্রজাদের সুরক্ষার স্বার্থে রানী লক্ষ্মীবাঈ তলোয়ার তুলে নেন।
সংক্ষেপে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যায় রাজ্যগ্রাস, দত্তক পুত্রের অধিকার অস্বীকার এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার তাগিদেই রানী লক্ষ্মীবাঈ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
B) ১৮৫৭ খ্রীঃ মহাবিদ্রোহের প্রকৃতির মূল্যায়ন করো।
মহাবিদ্রোহের প্রকৃতির প্রধান দিকগুলি নিচে মূল্যায়ন করা হলো:
১. সিপাহি বিদ্রোহ: চার্লস রেইকস, জন লরেন্স, জন কে এবং স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মতে, এটি ছিল মূলত বেতন-ভাতা ও এনফিল্ড রাইফেলের টোটো কেন্দ্রিক অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট একটি সামরিক অসন্তোষ বা ‘সিপাহি বিদ্রোহ’। তাঁদের মতে, এতে সার্বজনীন জাতীয় চেতনার অভাব ছিল।
২. সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে, পদচ্যুত রাজা, জমিদার ও সামন্তপ্রভুরা নিজেদের হারানো ক্ষমতা ও স্বার্থ পুনরুদ্ধারের জন্য এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। তাই এটি ছিল পুরাতন সামন্ততন্ত্রের ক্ষীয়মাণ প্রতিক্রিয়া। ড. আর সি মজুমদার বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন— “It was neither First, nor National, nor a War of Independence.”
৩. ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম: কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিনায়ক দামোদর সাভারকর, ড. পট্টভি সীতারামায়া প্রমুখ এটিকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাভারকর তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে প্রমান করার চেষ্টা করেছেন যে এটি বিদেশি শাসন উৎখাতের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা ছিল।
৪. গণবিক্ষোভ ও জাতীয় বিদ্রোহ: বেঞ্জামিন ডিিজরেলি, জন হোমস এবং আধুনিক অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, কেবল সিপাহি নয়— অযোধ্যা, রুহেলখণ্ড ও মধ্য ভারতের সাধারণ কৃষক, কারিগর ও সাধারণ মানুষ বিদ্রোহে গণ-অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে এটি কেবল সামরিক বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ না থেকে ‘জনবিদ্রোহ’ বা ‘জাতীয় বিদ্রোহ’-এর রূপ নিয়েছিল।
সংক্ষেপে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহের সূচনা সিপাহিদের হাত ধরে হলেও এবং এতে সামন্তশ্রেণির নেতৃত্ব থাকলেও, বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। তাই একে একটি মিশ্র প্রকৃতির ‘জাতীয় মহাবিদ্রোহ’ বলা যুক্তিযুক্ত।
৬. চারটি প্রশ্নের মধ্যে যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) ‘সম্পদের বহির্গমন’ তত্ত্বে দাদাভাই নওরোজির ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
সম্পদের বহির্গমন তত্ত্বে দাদাভাই নওরোজির মূল ভূমিকা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. তত্ত্বের প্রবর্তন ও গ্রন্থ প্রকাশ: ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভায় তিনি ‘England’s Debt to India’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রথম এই ড্রেন তত্ত্বের ধারণা দেন। পরবর্তীতে ১৯০১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Poverty and Un-British Rule in India’-তে তিনি তথ্য-পরিসংখ্যানসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন কীভাবে ভারতীয় সম্পদ অনবরত ইংল্যান্ডে পাচার হচ্ছে।
২. বহির্গমনের পথ ও রূপ প্রদর্শন: নওরোজী দেখান যে, ভারত থেকে কোনো প্রতিদান বা সমমূল্যের বিনিময় ছাড়াই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ নানা উপায়ে ব্রিটেনে চলে যাচ্ছে। এই রূপগুলি ছিল—
• হোম চার্জেস (Home Charges) বা প্রশাসনিক ব্যয়।
• ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ আধিকারিকদের বেতন, ভাতা ও পেনশন।
• মূলধন বিনিয়োগের ওপর অর্জিত লভ্যাংশ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের লাভ।
৩. ভারতের দারিদ্র্যের কারণ উদ্ঘাটন: নওরোজী প্রমান করে দেন যে, ভারতীয় প্রজা বা কৃষকদের আলস্যের কারণে দেশ দরিদ্র নয়; বরং এই অনবরত অর্থ ও সম্পদ নিষ্কাশনের ফলেই ভারত ক্রমাগত চরম দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হচ্ছে। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘Bleeding Drain’ বা রক্তক্ষরণকারী প্রক্রিয়া বলে অভিহিত করেন।
৪. জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ: নওরোজীর এই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং তৎকালীন শিক্ষিত সমাজকে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত শোষক চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে, যা পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান অর্থনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
সংক্ষেপে, দাদাভাই নওরোজী তাঁর ‘সম্পদের বহির্গমন’ তত্ত্বের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের ভণ্ডামি ও অর্থনৈতিক শোষণকে বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছিলেন।
B) নরমপন্থী বলতে তুমি কী বোঝো? কয়েকজন বিখ্যাত নরমপন্থী নেতার নাম লেখো।
১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কালে যে সকল নেতৃত্ব কংগ্রেস পরিচালনা করতেন, তাঁদের ‘নরমপন্থী’ বলা হয়।
• কর্মপদ্ধতি ও আদর্শ: এই গোষ্ঠীর নেতারা ব্রিটিশ সরকারের ন্যায়পরায়ণতা ও অনুকম্পার ওপর আস্থা রাখতেন। তাঁরা আবেদন-নিবেদন নীতি, স্মরণপত্র পেশ, প্রার্থনা, পিটিশন এবং আইনসম্মত সাংবিধানিক আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয়দের অভাব-অভিযোগ দূর করা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জানাতেন। তাঁদের এই নরম ও সাংবিধানিক পন্থার কারণে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এই নীতিকে ‘ভিক্ষাবৃত্তির রাজনীতি’ (Political Mendicancy) বলে সমালোচনা করতেন।
কয়েকজন বিখ্যাত নরমপন্থী নেতা:
১. দাদাভাই নওরোজী
২. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
৩. গোপালকৃষ্ণ গোখলে
৪. উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৫. ফিরোজশাহ মেহতা
৬. দিনশা ওয়াচা
C) অনুশীলন সমিতি কে ও কবে প্রতিষ্ঠা করেন? অনুশীলন সমিতির প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মার্চ (১২ই চৈত্র, ১৩০৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতায় বিপ্লবাচার্য সতীশচন্দ্র বসু অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন (তাঁর এই উদ্যোগে সবিশেষ উৎসাহ ও সাহায্য প্রদান করেছিলেন ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র)।
প্রথম সভাপতি: অনুশীলন সমিতির প্রথম সভাপতি ছিলেন ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র (পি. মিত্র)।
D) ১৯৩০ খ্রীঃ ডান্ডি অভিযানের কারণ ও তাৎপর্য আলোচনা করো।
১. লবণ আইনের অন্যায় ও শোষণ: লবণ ছিল ভারতের সাধারণ ও দরিদ্রতম মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য উপাদান। ব্রিটিশ সরকার লবণের ওপর চড়া হারে কর ধার্য করে এবং সাধারণ মানুষের নিজ হাতে লবণ তৈরি আইনত নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষণা করে। এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই গান্ধীজি লবণ আইনকে আন্দোলনের সূচক হিসেবে বেছে নেন।
২. আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা: ১৯২৯ সালের লাহোর কংগ্রেসে গৃহীত ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য একটি সর্বভারতীয় গণআন্দোলনের প্রয়োজন ছিল। ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে গান্ধীজি আইন অমান্য আন্দোলনের (Civil Disobedience Movement) আনুষ্ঠানিক সূচনা করতে চেয়েছিলেন।
ডান্ডি অভিযানের তাৎপর্য:
১. সর্বভারতীয় গণআন্দোলনের উদ্দীপনা: ১৯৩০ সালের ৬ই এপ্রিল গান্ধীজি ডান্ডি উপকূলে সমুদ্রের জল ফুটিয়ে একমুঠো লবণ তৈরি করে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশের লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এই ঘটনা সমগ্র ভারতে দাবানলের মতো আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
২. নারী সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ: ডান্ডি অভিযানের অন্যতম প্রধান সাফল্য ছিল ভারতীয় নারীদের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। সরোজিনী নাইডু, কস্তুরবা গান্ধী, কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের মতো নারী নেতৃবৃন্দের পরিচালনায় হাজার হাজার নারী রাস্তায় নেমে রাজপথ ও দোকান পিকেটিংয়ে অংশ নেন।
৩. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ব্রিটিশ মর্যাদায় আঘাত: ডান্ডি অভিযানের খবর বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যা ব্রিটিশ সরকারের অনৈতিক ও অত্যাচারী শাসনকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্মোচিত করে দেয় এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামকে এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
৭. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) ভারতের সংবিধানে ১৫ নং অনুচ্ছেদে নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
অনুচ্ছেদ ১৫-এর অধীনে নারীর ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষার বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো:
১. লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বেআইনি ঘোষণা [১৫(১) অনুচ্ছেদ]:
১৫(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেবল ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ (Sex) বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের প্রতি কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। এটি কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের প্রতি চলে আসা চিরাচরিত সামাজিক বৈষম্যকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করে নারীদের সমান মর্যাদা সুনিশ্চিত করেছে।
২. সর্বসাধারণের স্থানে সমান প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা [১৫(২) অনুচ্ছেদ]:
১৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল লিঙ্গগত কারণে কোনো নারীকে—
• দোকান, সার্বজনীন রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং জনসাধারণের বিনোদনমূলক স্থানে প্রবেশে বাধা দেওয়া যাবে না।
• সরকারি বা আংশিক সরকারি অর্থে পরিচালিত বা সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উৎসর্গীকৃত কূপ, স্নানের ঘাট, জলাশয়, রাস্তা ও জনসেবামূলক স্থানে প্রবেশ বা ব্যবহারে কোনো বাধা বা শর্ত আরোপ করা যাবে না।
এই বিধানটি বিশেষ করে ভারতের গ্রামীণ ও ঐতিহ্যবাহী সমাজে নারীদের সামাজিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে।
৩. নারীদের জন্য বিশেষ আইন ও সংরক্ষণের সাংবিধানিক অনুমোদন [১৫(৩) অনুচ্ছেদ]:
অনুচ্ছেদ ১৫-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী অংশ হলো ১৫(৩) অনুচ্ছেদ। এতে বলা হয়েছে— সাধারণ বৈষম্যহীনতার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও, রাষ্ট্র চাইলে নারী ও শিশুদের বিশেষ সুরক্ষার জন্য এবং তাঁদের অগ্রগতির স্বার্থে যেকোনো ধরনের বিশেষ আইন, ইতিবাচক পদক্ষেপ (Positive Discrimination) বা আসন সংরক্ষণ গ্রহণ করতে পারবে। এটি মূল সমতার নীতির ব্যতিক্রম হলেও নারীদের পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে তুলে আনার জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় অনুঘটক।
১৫(৩) অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত প্রধান প্রধান সামাজিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ:
• রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংবিধানের ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনের মাধ্যমে পঞ্চায়েত ও পুরসভায় নারীদের জন্য ন্যূনতম ৩৩% (অনেক রাজ্যে ৫০%) আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে।
• সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা: পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন (২০০৫), কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইন (POSH Act, ২০১৩) এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন (Maternity Benefit Act)-এর মতো যুগান্তকারী আইনসমূহ প্রণীত হয়েছে।
• অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত সুযোগ: কন্যাশিশুদের শিক্ষায় উৎসাহিত করতে বিশেষ উপবৃত্তি, সরকারি চাকরিতে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে আর্থিক আত্মনির্ভরতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সংক্ষেপে, সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ কেবল কাগজে-কলমে পুরুষ ও নারীর মধ্যে সমতা স্থাপন করেনি, বরং ১৫(৩) অনুচ্ছেদের ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তব জীবনে নারীদের স্বাবলম্বী, সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করে তোলার জন্য রাষ্ট্রকে পূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রদান করেছে।
B) নেহেরু-মহলানবিশ মডেল কী?
নেহেরু-মহলানবিশ মডেলের প্রধান মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভারী ও মৌলিক শিল্পে অগ্রাধিকার: এই মডেলের মূল কৌশল ছিল ভারী এবং ক্যাপিটাল গুডস শিল্প (যেমন: ইস্পাত, ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক, শক্তিসম্পদ ও ভারী যন্ত্রপাতি) স্থাপনে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া। উদ্দেশ্য ছিল দেশের শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে অন্যান্য শিল্পের বিকাশ দ্রুত ঘটে।
২. রাষ্ট্রীয় বা সরকারি খাতের সম্প্রসারণ: মৌলিক ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠায় বিপুল মূলধনের প্রয়োজন ছিল, যা তৎকালীন বেসরকারি খাতের পক্ষে জোগানো সম্ভব ছিল না। ফলে এই মডেলে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বৃদ্ধি করা হয় এবং পাবলিক সেক্টর বা সরকারি খাতকে নেতৃত্বের স্থানে বসানো হয়।
৩. আমদানি বিকল্পায়ন ও স্বাবলম্বিতা: বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ ও ক্যাপিটাল গুডস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে নিজস্ব শিল্পভিত্তি গড়ে তোলাই ছিল এই মডেলের অন্যতম মূল লক্ষ্য, যাতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর হতে পারে।
৪. সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ প্রতিষ্ঠা: অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে ভারতে এক মিশ্র অর্থনৈতিক সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা এই মডেলে অগ্রাধিকার পায়।
সংক্ষেপে, নেহেরু-মহলানবিশ মডেল ছিল কৃষিভিত্তিক ভারতকে একটি স্বাবলম্বী ও আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার এক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যা ভারতের শিল্পায়নের বুনিয়াদ স্থাপন করেছিল।
৮. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) ১৯৭১ খ্রীঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা কী ছিল?
ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান ভূমিকা ও অবদানসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. শরণার্থী সংকট মোকাবেলা ও মানবিক সহায়তা: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করলে প্রায় এক কোটি নিঃস্ব বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেন। ইন্দিরা গান্ধী বিপুল অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও অত্যন্ত মানবিকতার সাথে এই শরণার্থীদের খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।
২. আন্তর্জাতিক জনমত গঠন ও কূটনৈতিক সাফল্য: ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশসমূহ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাশক্তিগুলির কাছে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নারকীয় অত্যাচারের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে নিয়ে আসেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঐতিহাসিক ‘ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি’ স্বাক্ষর করে তিনি মার্কিন-চীন অক্ষের সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপকে প্রতিহত করেন।
৩. মুক্তিবাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা: তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং মুক্তিকামী বাঙালি যুবকদের গঠিত ‘মুক্তিবাহিনী’-কে প্রয়োজনীয় অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, ওষুধ ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেন, যা পাকিস্তানি দখলদারদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালনায় প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
৪. সামরিক নেতৃত্ব ও সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা: ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিমানঘাঁটিগুলোতে হামলা চালালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
৫. বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও নতুন রাষ্ট্রের বিকাশ: ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সংসদে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ঘোষণা করেন। যুদ্ধ জয়ের পর বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং স্বাধীন দেশ থেকে দ্রুত ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের বিষয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
সংক্ষেপে, ইন্দিরা গান্ধীর অসীম সাহস, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কে নিশ্চিত করেছিল।
B) ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তির (১৯৭১ খ্রীঃ) ওপর একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।
ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তির মূল প্রেক্ষাপট, শর্ত ও তাৎপর্য নিচে আলোচনা করা হলো:
১. স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপট: ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতা এবং ভারতে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আগমনের ফলে ভারত এক চরম সংকটে পড়ে। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন করে এক ‘মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষ’ তৈরি করে। এই ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও হুমকির মোকাবেলা করতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এই চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন।
২. চুক্তির প্রধান শর্তসমূহ:
• উভয় দেশ পারস্পরিক শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বজায় রাখবে।
• কোনো এক দেশ কোনো তৃতীয় শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হলে বা আক্রমণের হুমকির সম্মুখীন হলে, দুই দেশ অবিলম্বে যৌথ আলোচনায় বসবে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
• কোনো দেশই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক জোটে যোগ দেবে না বা প্রতিপক্ষের ক্ষতি করে এমন কোনো বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করবে না।
৩. ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
• কূটনৈতিক নিরাপত্তা: এই চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখে এবং ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
• জাতিসংঘে সোভিয়েত ভেটো: ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় জাতিসংঘে যখনই আমেরিকার উদ্যোগে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হয়, তখনই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পক্ষে পর পর ৩ বার ‘ভেটো’ (Veto) প্রয়োগ করে ভারতের কৌশলগত সুবিধা সুনিশ্চিত করে।
• বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ: এই চুক্তির ফলে ভারত সামরিক নিশ্চিন্তে ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর থেকে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে মাত্র ১৩ দিনে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সক্ষম হয়।
সংক্ষেপে, ১৯৭১ সালের ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি ছিল ভারতীয় কূটনৈতিক ইতিহাসের এক চরম সফল পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করেছিল।
৯. যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A) ভারতে চরমপন্থী আন্দোলনের উৎপত্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী বিবেকানন্দের অবদান আলোচনা করো।
১. চরমপন্থী আন্দোলনের উৎপত্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান:
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলা হয় ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ঋষি’। তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক উপন্যাস ও রচনার মাধ্যমে চরমপন্থী ভাবধারার যে বিকাশ ঘটেছিল, তা নিম্নরূপ:
• ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের উন্মেষ: ১৮৭৫ সালে রচিত এবং পরবর্তীতে ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসে সংযোজিত ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি ভারতীয়দের কাছে কোনো সাধারণ গান ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী বিপ্লবীদের বীজমন্ত্র। ব্রিটিশদের তৈরি জাতীয় পতাকার অবমাননা রোধ করে তরুণরা এই এক মন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
• স্বদেশকে ‘মাতৃরূপ’ দান: বঙ্কিমচন্দ্রই প্রথম স্বদেশকে কেবল মাটি বা মানচিত্র হিসেবে না দেখে তাঁকে ‘জগদ্ধাত্রী’, ‘কালী’ ও ‘দুর্গা’ রূপী জীবন্ত দেবী বা ‘স্বদেশ মাতা’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি দেখান যে মাতৃভূমির সেবা করা পরম ধর্ম এবং এই স্বদেশপ্রীতি ভারতীয়দের মনে এক অলৌকিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা চরমপন্থীদের আত্মত্যাগের মূল প্রেরণা ছিল।
• ‘আনন্দমঠ’ ও বিপ্লবী আদর্শ: ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘সন্তান দল’-এর ত্যাগ, শৃঙ্খলা ও সশস্ত্র সংগ্রামের যে চিত্র বঙ্কিমচন্দ্র এঁকেছিলেন, তা পরবর্তীকালের অনুুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো চরমপন্থী বিপ্লবী সংগঠনগুলির সরাসরি আদর্শিক ব্লু-প্রিন্ট হিসেবে কাজ করে।
• ‘অনুশীলন তত্ত্ব’ ও জাতীয় আত্মমর্যাদা: তাঁর ‘অনুশীলন তত্ত্ব’ গ্রন্থে তিনি আত্মশক্তি অর্জন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠার শিক্ষা দেন। এটি অনুুশীলন সমিতির নামকরণের পেছনেও প্রেরণা যুগিয়েছিল।
২. চরমপন্থী আন্দোলনের উৎপত্তিতে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান:
স্বামী বিবেকানন্দ কোনো সক্রিয় রাজনীতি করেননি, কিন্তু তাঁর আত্মিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ভারতকে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। ভগিনী নিবেদিতা যথার্থই বলেছিলেন— “Vivekananda was a patriot first and a prophet next.”
• ক্ষাত্রতেজ ও শক্তির উপাসনা: নরমপন্থীদের দুর্বল অনুনয়-বিনয়কে উড়িয়ে দিয়ে বিবেকানন্দ বীরত্ব ও শক্তির বাণী প্রচার করেন। তিনি যুবসমাজকে আহ্বান জানান— “আমাদের দরকার লোহার পেশী ও ইস্পাতের স্নায়ু।” তাঁর এই উপাসনা চরমপন্থীদের অহিংস আন্দোলন ছেড়ে সক্রিয় ও সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে ধাবিত করে।
• ‘স্বদেশ মন্ত্র’ ও দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা: তাঁর ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থের ‘স্বদেশ মন্ত্র’-এ তিনি ঘোষণা করেন— “অজ্ঞাত ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই… ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর।” এই সার্বজনীন স্বদেশপ্রেম তরুণদের মধ্যে চরম জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
• পরা অধীনতার বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত: বিবেকানন্দ ভারতীয়দের জাতীয় হীনমন্যতা দূর করে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন, “দুর্বলতাই পাপ, দুর্বলতাই মৃত্যু।” এই আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাবই অরবিন্দ ঘোষ, বাল গঙ্গাধর তিলক এবং বিপিনচন্দ্র পালের মতো চরমপন্থী নেতাদের শক্তি যুগিয়েছিল।
• বিপ্লবীদের প্রত্যক্ষ পাঠ্য ও প্রেরণা: পরবর্তীকালের অরবিন্দ ঘোষ, মাস্টারদা সূর্য সেন, বাঘা যতীনের মতো বিপ্লবী নেতারা স্বীকার করেছেন যে স্বামীজীর গ্রন্থাবলী তাঁদের প্রধান প্রেরণা ছিল। এমনকি ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা (IB Report)-তেও উল্লেখ করা হয় যে, অরবিন্দ ঘোষ ও অন্যান্য চরমপন্থীদের আস্তানা থেকে প্রাপ্ত প্রধান পাঠ্যবইগুলোর মধ্যে স্বামীজীর রচনাবলী ছিল শীর্ষস্থানে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বদেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করে ভারতীয়দের হৃদয়ে ভক্তি ও জাতীয়তাবাদের যে বীজ রোপণ করেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দ শক্তির উপাসনা ও কর্মযোগের আহ্বানে তাকে এক দুর্দমনীয় বিপ্লবে রূপান্তর করেন। তাঁদের প্রবর্তিত এই আত্মশক্তি ও জাতীয় আত্মমর্যাদাবোধই পরবর্তীতে তিলক, অরবিন্দ ও লালা লাজপত রায়ের নেতৃত্বে চরমপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে।
B) ভারত-ছাড়ো আন্দোলনের কারণ কী ছিল? এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
ভারত-ছাড়ো আন্দোলনের কারণসমূহ:
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই আগস্ট মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে সমগ্র ভারতজুড়ে যে অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের সূচনা হয়, তা ‘ভারত-ছাড়ো আন্দোলন’ (Quit India Movement) বা ‘আগস্ট বিপ্লব’ নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের প্রধান কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয়দের সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে ১৯৪২ সালে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ভারতে আসেন। কিন্তু ক্রিপস মিশন ভারতকে তাৎক্ষণিক পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধশেষে অস্পষ্ট ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’-এর প্রস্তাব দেয়। গান্ধীজি একে “ভবিষ্যতের ভেঙে পড়া ব্যাংকের ওপর কাটা চেক” (Post-dated cheque on a failing bank) বলে প্রত্যাখান করেন। এই ব্যর্থতা চরম রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি করে।
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব ও অর্থনৈতিক সংকট: যুদ্ধের কারণে ভারতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। চাল, ডাল, কয়লা ও বস্ত্রের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ব্রিটিশ সরকারের মুদ্রাস্ফীতি ও জোরপূর্বক যুদ্ধ তহবিলের জন্য অর্থ আদায় সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।
৩. জাপানি আক্রমণের আশঙ্কা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অক্ষশক্তির (জাপান) দ্রুত অগ্রগতি ভারতকে সরাসরি যুদ্ধের হুমকির মুখে ফেলে দেয়। গান্ধীজি অনুধাবন করেন যে, ভারতে ব্রিটিশদের উপস্থিতিই জাপানকে ভারত আক্রমণের অজুহাত দিচ্ছে। তাই ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলে জাপানি আক্রমণের আশঙ্কা দূর হবে।
৪. পোড়ামাটি নীতি (Scorch Earth Policy): জাপানি আক্রমণ ঠেকানোর নামে ব্রিটিশ সরকার বাংলায় ও উপকূলীয় অঞ্চলে ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করে হাজার হাজার নৌকা ও যানবাহন ধ্বংস করে দেয়। এতে কৃষক, জেলে ও ব্যবসায়ীদের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায় এবং সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়।
৫. জনসাধারণের ক্ষোভ ও নেতৃত্বের প্রস্তুতি: ১৯৩৯ সালে ভারতীয়দের সাথে আলোচনা না করেই ভারতকে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই জনমনে তীব্র ক্ষোভ ছিল। ফলে কংগ্রেস অনুধাবন করে যে, ব্রিটিশদের অবিলম্বে ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য একটি চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক আন্দোলনের এটাই উপযুক্ত সময়।
ভারত-ছাড়ো আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণসমূহ:
ভারত-ছাড়ো আন্দোলন প্রবল গণআবেগ সৃষ্টি করলেও সাময়িকভাবে এটি কিছু কারণে ব্যর্থ হয়েছিল:
১. শীর্ষ নেতৃত্বের গ্রেফতার ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাব: ৯ই আগস্টের প্রথম প্রহরেই ‘অপারেশন জিরো আওয়ার’-এর মাধ্যমে গান্ধীজি, নেহেরু, প্যাটেল সহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। ফলে আন্দোলনটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে।
২. ব্রিটিশ সরকারের বর্বরোচিত দমননীতি: আন্দোলন দমনে ব্রিটিশ সরকার চরম নজিরবিহীন অত্যাচার চালায়। আকাশপথে বোমা বর্ষণ, নির্বিচারে গুলি, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং প্রায় এক লক্ষ মানুষকে কারারুদ্ধ করে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
৩. কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর বিরোধিতা: এই আন্দোলনে দেশের সব রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, ড. বি. আর. আম্বেদকরের শিডিউলড কাস্টস ফেডারেশন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) নানা কৌশলগত কারণে এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে বা নিষ্ক্রিয় থাকে।
সংক্ষেপে, ভারত-ছাড়ো আন্দোলন সাময়িকভাবে ব্যর্থ মনে হলেও, এটি ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে এমনভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল যে এর পর ভারতে ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
