Class 12 Semester 4 Bangla Question Paper with Solution PDF 2025-26
উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণীর চতুর্থ সেমিস্টারের বাংলা প্রশ্নপত্র উত্তরসহ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য এখানে PDF আকারে দেওয়া হলো। এই পোস্টে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও সহজবোধ্য সমাধান দেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের উত্তর মিলিয়ে দেখতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে নিতে পারে। Class 12 Semester 4 Bangla Question Paper with Solution PDF 2025-26 শিক্ষার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও পুনরাবৃত্তির জন্যও সহায়ক হবে।
১. দুটি প্রশ্নের মধ্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও (অনধিক ১৫০ শব্দে):
A. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের নবীন চরিত্রটি আলোচনা করো।
স্বার্থপরতা ও বিষয়বুদ্ধি: নবীন চরিত্রটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার বৈষয়িক লোভ। কাকা বলাই চক্রবর্তী খুন হওয়ার পর তার বিপুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হয় নবীন। সেই সম্পত্তির দখল নেওয়ার জন্যই সে শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসে।
ভণ্ডামি ও ছলনা: কাকার মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য নবীন কতটা আন্তরিকভাবে শোকাহত ছিল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে গ্রামবাসীদের সামনে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখার জন্য সে কৃত্রিম শোক প্রকাশ করে। জামার খুঁটে চশমা মোছার ছলে চোখ মোছার ঘটনায় তার এই ছলনাময় স্বভাব প্রকাশ পায়।
আভিজাত্য ও আত্মসম্মানবোধ: নবীন নিজের সামাজিক মর্যাদা ও বংশের মান-সম্মানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। শুধু সম্পত্তির লোভে সে গ্রামে এসেছে—এমন বদনাম এড়াতে সে কাকার হত্যাকারীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।
কুসংস্কারচ্ছন্ন মানসিকতা: শহরে থাকার সুযোগ পেলেও নবীনের মানসিকতা কুসংস্কারমুক্ত হয়নি। স্ত্রী দামিনীর অসুস্থতাকে সে অপচ্ছায়া বা ভূতের প্রভাব বলে মনে করে এবং ডাক্তারের পরিবর্তে ওঝার ঝাড়ফুঁকের ওপর বেশি নির্ভর করে। তবে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে পরে ডাক্তার ডাকতেও উদ্যোগী হয়।
উপসংহার: সব মিলিয়ে, নবীন চরিত্রের মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামীণ সমাজের এক স্বার্থপর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং জটিল মানসিকতার মানুষের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। তার চরিত্রের বৈপরীত্য ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ‘হলুদ পোড়া’ গল্পকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
B. ‘অসম্ভব দুশ্চিন্তা হলো গৌরবির’। গৌরবির পরিচয় দাও। গৌরবির দুশ্চিন্তার কারণ কী?
১. গৌরবির পরিচয়:
- শারীরিক অবস্থা: গৌরবি জন্ম থেকেই পঙ্গু। তাঁর একখানা পা বাঁকা এবং গোড়ালি ও আঙুলগুলো পেছনের দিকে মোড়ানো। ফলে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে বা দ্রুত হাঁটতে পারেন না।
- পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতি: গৌরবি এক পুত্র নিবারণ ও এক কন্যা পুঁটি/সাবিত্রীর জননী হলেও চরম স্বজনহারা। মেয়ের সংসার অভাবগ্রস্ত এবং সচ্ছল পুত্র নিবারণ পুরোনো ক্ষোভ ও হিংসা থেকে মাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে তিনি দূরসম্পর্কের ভাইপো মুকুন্দের দেওয়া এক আশ্রয়টুকুতে থেকে বিলের ধার থেকে শাক-পাতা, থানকুনি ও ডুমুরের ডাল কুড়িয়ে বিক্রি করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটান।
২. গৌরবির দুশ্চিন্তার কারণ:
প্রতিবেশী মুসলমান নারী আয়েছা বিবি (হারার মা) মারা যাওয়ার পর তাঁর সাত বছরের মাতৃহারা এতিম ছেলে হারা ওরফে হারুন গৌরবির ঘরে এসে আশ্রয় নিলে গৌরবির মনে তীব্র দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। তাঁর দুশ্চিন্তার প্রধান কারণগুলি হলো—
- নিজের চরম দারিদ্র্য ও অন্নসংস্থান: গৌরবি নিজেই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটান। প্রতিদিন মেটে আলু সেদ্ধ বা একগাল খুদ খেয়ে তাঁকে বাঁচতে হয়। নিজেরই যেখানে একবেলা ভাতের সংস্থান নেই, সেখানে সাত বছরের একটি অবোধ শিশুর দায়িত্ব কীভাবে সামলাবেন, তা ভেবে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েন।
- সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন: গৌরবি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং হারা মুসলমান ধর্মের সন্তান। রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজে অন্য ধর্মের একটি এতিম ছেলেকে নিজের কাছে আশ্রয় দেওয়া বা খাওয়ানোকে সমাজ ‘জাত যাওয়া’ বা ‘ছোঁয়ানেপা’ হিসেবে দেখবে বলে তিনি শঙ্কিত ছিলেন।
- নিরাশ্রয় হওয়ার ভয়: অভিভাবকহীন বালক হারাকে নিজের উঠোনে ঠাঁই দিলে সমাজের মানুষ তো বটেই, এমনকি আশ্রয়দাতা মুকুন্দও তাঁকে ভিটে থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় গৌরবির মন অসম্ভব দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
উপসংহার: গৌরবির দুশ্চিন্তার মধ্যে তাঁর নিজের দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব এবং সামাজিক ভয়ের পাশাপাশি মাতৃসুলভ মমতারও প্রকাশ ঘটেছে। একজন অসহায় শিশুকে আশ্রয় দেওয়ার মানবিক আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজের কঠোর বাস্তবতার দ্বন্দ্বই তাঁর দুশ্চিন্তার মূল কারণ।
২. যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A. ‘মধ্যবিত্তমদির জগতে / আমরা বেদনাহীন—অন্তহীন বেদনার পথে।’ — পংক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
পংক্তিটির তাৎপর্য:
- ‘মধ্যবিত্তমদির জগত’-এর অর্থ: ‘মদির’ শব্দের অর্থ মোহগ্রস্ত বা নেশাচ্ছন্ন। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক অবক্ষয়ের চরম সময়েও মধ্যবিত্ত সমাজ নিজেদের সংকীর্ণ গণ্ডি, কৃত্রিম স্বাচ্ছন্দ্য ও অসাড় মানসিকতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল। বাস্তব জগতের তীব্র যন্ত্রণা থেকে চোখ ফিরিয়ে তারা নিজেদের এক কল্পিত আত্মসুখের জগতে বন্দি করে রেখেছিল। কবি তাঁদের এই মোহগ্রস্ত ও অসাড় মানসিক জগতকেই ‘মধ্যবিত্তমদির জগত’ বলেছেন।
- ‘বেদনাহীন’ কথাটির তাৎপর্য: মধ্যবিত্ত সমাজ নিজেদের ব্যক্তিগত হতাশা ও নানা কৃত্রিম আবেগকে বেদনা বলে মনে করলেও সমাজের প্রকৃত দুঃখ-দুর্দশার প্রতি তাদের সংবেদনশীলতা ছিল না। লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে নর্দমা ও ফুটপাতে ঘুরে বেড়ানো সর্বহারা মানুষের জীবনযন্ত্রণার সামনে মধ্যবিত্তের এই তথাকথিত বেদনা নিতান্তই অর্থহীন ও অনুভূতিহীন।
- ‘অন্তহীন বেদনার পথে’-এর তাৎপর্য: বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি আত্মপ্রবঞ্চনা ও নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে জীবন কাটায়। তারা সমাজের অন্ধকার ও অবক্ষয় দূর করার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয় না। ফলে তাদের এই অসার ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপন শেষ পর্যন্ত এক দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তহীন বেদনার পথ তৈরি করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, উদ্ধৃত পংক্তিতে জীবনানন্দ দাশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভণ্ডামি, নিষ্ক্রিয়তা, অসাড়তা ও আত্মমোহগ্রস্ততার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রকৃত সামাজিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে কীভাবে এই শ্রেণি এক অসার ও অন্তহীন যন্ত্রণার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, পংক্তিটিতে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
B. ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে / বাবা এল। / ছেলে এল না।’ — উদ্ধৃত পংক্তিটির প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
১. কবিতাটি লেখার প্রেক্ষাপট:
- উৎসবের আনন্দ বনাম সামাজিক অস্থিরতা: পূজোর মুখে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে নতুন জামাকাপড় কেনার সাধারণ আনন্দের প্রতীক্ষার মধ্যেই অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে।
- রাজনৈতিক হিংসা ও অনিশ্চিত জীবন: রাজনৈতিক সংঘাত, বোমাবাজি ও দাঙ্গার মতো হিংসাত্মক পরিস্থিতি কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটি সাধারণ পরিবারের হাসিখুশি পরিবেশকে শোক ও মৃত্যুর পরিবেশে পরিণত করে, কবিতায় সেই নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।
২. ছেলের ঘরে না ফেরার কারণ:
- কৌতূহল ও অবোধ মন: মাইনে নিয়ে বাবা সকাল-সকাল বাড়ি ফিরবে এবং পূজোর কেনাকাটা হবে—এই আশায় ছেলেটি সারাদিন অপেক্ষা করে। সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর রাত হলেও বাবা না ফেরায় এবং মোড়ের মাথায় আলো, কালো গাড়ি ও ‘বাজি ফোটার’ মতো বিকট শব্দ শুনে সে কৌতূহলবশত রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে।
- রাজনৈতিক সংঘাতের বলি: রাজনৈতিক দাঙ্গা ও সংঘাতের উত্তপ্ত পরিবেশে মোড়ের মাথায় ঘটে যাওয়া বোমাবাজির শিকার হয় নিরপরাধ ছেলেটি। রাজনৈতিক হিংসার নির্মমতায় সে প্রাণ হারায়।
- ভাগ্যের চরম বিপর্যয়: বাবা নানা বাধা ও মৃত্যুর আশঙ্কা পেরিয়ে ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে’ গভীর রাতে বাড়ি ফিরে এলেও কৌতূহলবশত বাইরে বেরিয়ে যাওয়া ছেলেটি আর ফিরে আসতে পারেনি।
উপসংহার: ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে / বাবা এল। / ছেলে এল না।’—এই পংক্তিগুলিতে রাজনৈতিক হিংসার নির্মমতা এবং নিরপরাধ মানুষের অসহায় মৃত্যুর করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। একজন বাবা মৃত্যুকে অতিক্রম করে ঘরে ফিরলেও তাঁর সন্তানের আর ফিরে না আসার ঘটনায় কবিতার বেদনাময় পরিণতি আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
৩. যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A. ‘এই তো জীবনের সত্য কালীনাথ’— জীবনের সত্য কী? বক্তা কীভাবে এই সত্যে উপনীত হলেন?
১. জীবনের সত্য:
রজনীকান্তের উপলব্ধিতে জীবনের আসল সত্য হলো—
- শিল্পীর কোনো বয়স নেই: যার মধ্যে প্রকৃত প্রতিভা ও শিল্পবোধ রয়েছে, বার্ধক্য তাকে স্পর্শ করতে পারে না। দেহের বয়স বাড়লেও শিল্পীর প্রতিভা অমলিন থাকতে পারে।
- শিল্পের অমরতা: রূপ, যৌবন, ধন-সম্পদ ও সামাজিক সম্মান সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও প্রকৃত শিল্প ও শিল্পীর প্রতিভা চিরস্থায়ী। শিল্পের কোনো জরা বা বয়স নেই—এটাই রজনীকান্তের উপলব্ধি করা জীবনের সত্য।
২. বক্তা কীভাবে এই সত্যে উপনীত হলেন:
- অতীতের স্মৃতি ও বর্তমানের শূন্যতা: একসময় রজনীকান্ত মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের ভালোবাসা ও করতালি পেয়েছেন। কিন্তু বার্ধক্যে এসে একাকিত্ব ও নিরাশার মধ্যে তিনি উপলব্ধি করেন যে রূপ, যৌবন, প্রেম ও সামাজিক মর্যাদা সবই ক্ষণস্থায়ী।
- কালীনাথের উপস্থিতি ও অভিনয়ের উদ্দীপনা: নিরাশায় ডুবে থাকা রজনীকান্ত কালীনাথের মুখোমুখি হয়ে আবার অভিনয়ের উন্মাদনা অনুভব করেন। তিনি কালীনাথকে সঙ্গে নিয়ে শেক্সপিয়রের ‘রিচার্ড দ্য থার্ড’, ‘ওথেলো’ এবং ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এর কালজয়ী সংলাপ আবৃত্তি করতে থাকেন।
- প্রতিভার অটুট উপস্থিতির উপলব্ধি: অভিনয়ের সময় রজনীকান্ত বুঝতে পারেন যে তাঁর শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও তাঁর অভিনয়প্রতিভা ও আবেগের শক্তি এখনও অম্লান। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে উপলব্ধি করায় যে ক্ষয়িষ্ণু দেহের ঊর্ধ্বে শিল্প ও শিল্পীর প্রতিভা চিরন্তন।
উপসংহার: এই উপলব্ধি থেকেই রজনীকান্ত দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘যার প্রতিভা আছে, বয়সে তার কী এসে যায়!’ বার্ধক্য ও শারীরিক ক্ষয়কে অতিক্রম করে শিল্পীর প্রতিভাই যে জীবনের প্রকৃত ও চিরন্তন সত্য—এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই তিনি জীবনের সেই সত্যে উপনীত হয়েছেন।
B. ‘পুরোনো দিনের কথা ভুলে যান চাটুজ্জেমশাই।’ — উক্তিটির প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য আলোচনা করো।
১. প্রেক্ষাপট/প্রসঙ্গ:
- গভীর রাতে থিয়েটার শেষ হওয়ার পর মদ্যপ অবস্থায় রজনীকান্ত ফাঁকা নাট্যমঞ্চে এসে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন।
- তিনি তাঁর অতীত জীবনের নানা স্মৃতি—তরুণ বয়সের সুদর্শন চেহারা, বড়ঘরের একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম এবং সেই মেয়েটির দেওয়া শর্তের কারণে থিয়েটারকে বেছে নিয়ে প্রেম বিসর্জন দেওয়ার করুণ ইতিহাস—কালীনাথের কাছে তুলে ধরছিলেন।
- অতীতের হারানো সোনালি দিন, প্রেম ও ব্যর্থতার স্মৃতিতে রজনীকান্ত যখন অনুশোচনা ও বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তখন তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কালীনাথ বলেন, ‘পুরোনো দিনের কথা ভুলে যান চাটুজ্জেমশাই।’
২. পুরোনো দিনের কথা ভুলতে বলার কারণ:
- স্মৃতির তীব্র যন্ত্রণা ও বিষাদ: অতীতের উজ্জ্বল সাফল্য এবং হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার কথা মনে করলে বৃদ্ধ রজনীকান্তের মানসিক কষ্ট আরও বেড়ে যেত। তাই কালীনাথ মনে করেছিলেন, অতীতকে আঁকড়ে থাকলে বর্তমানের যন্ত্রণা আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে।
- অতীতের অপরিবর্তনীয়তা: জীবনের যে সময় চলে গেছে, যে সম্মান ও প্রেম হারিয়ে গেছে, তা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অতীতের জন্য অযথা শোক বা অনুশোচনা করে কোনো লাভ নেই।
- বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া: রজনীকান্তের বয়স তখন ৬৮ বছর। তাঁর যৌবনের দিন আর নেই। বার্ধক্য, একাকীত্ব ও ক্ষয়িষ্ণু জীবনই তাঁর বর্তমান বাস্তবতা। অতীতের স্মৃতির মোহ থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানকে মেনে নিয়ে শান্তিতে থাকার জন্যই কালীনাথ তাঁকে পুরোনো দিনের কথা ভুলে যেতে বলেছিলেন।
উপসংহার: কালীনাথের এই উক্তির মধ্যে রজনীকান্তের প্রতি তাঁর আন্তরিক সহানুভূতি ও বাস্তববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। অতীতের সুখ-দুঃখে ডুবে না থেকে বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই যে জীবনের পক্ষে শ্রেয়—এই বার্তাই উক্তিটির মূল তাৎপর্য।
৪. যে-কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A. ‘অমন নবীন চোখ তো আমার নেই তবু তোমার দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমিও দেখতে পাচ্ছি।’ — কে, কাকে একথা বলেছে? বক্তা কী দেখতে পেয়েছিলেন?
১. কে, কাকে একথা বলেছে:
- বক্তা: উক্তিটির বক্তা হলেন নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র ঠাকুরদা।
- শ্রোতা: তিনি অসুস্থ ও গৃহবন্দি বালক অমলকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলেছেন।
২. বক্তা কী দেখতে পেয়েছিলেন:
- পাহাড় ও ঝরনার দৃশ্য: অমল জানলা দিয়ে দূরের পাহাড় ও ঝরনাকে নিজের নির্মল কল্পনার চোখে দেখছিল। পাহাড়টিকে তার মনে হয়েছিল যেন হাত তুলে কাউকে ডাকছে। ঝরনার জল নুড়ি-পাথরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়ার দৃশ্যকে সে আনন্দে হাততালি দিতে দিতে ছুটে চলার মতো কল্পনা করেছিল। ঠাকুরদাও অমলের সেই কল্পনার মধ্য দিয়ে দৃশ্যটি দেখতে পেয়েছিলেন।
- দূর দেশের অজানা পথ: অমলের মন জানলার ওপারে চলে যাওয়া অজানা গ্রাম ও অচেনা পথের দিকে ছুটে যেতে চাইছিল। তার সেই ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঠাকুরদাও দূর দেশের অদেখা সৌন্দর্য, মুক্ত আকাশ ও শ্যামল প্রকৃতিকে অনুভব করেছিলেন।
- মুক্তির আনন্দ: অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ বৃদ্ধ চোখে যা সহজে ধরা পড়ে না, অমলের নিষ্পাপ ও নবীন দৃষ্টির সাহায্যে ঠাকুরদা সেই বন্ধনহীন মুক্তির আনন্দ ও অসীম সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করেছিলেন।
উপসংহার: অমলের নির্মল কল্পনাশক্তি এতটাই শক্তিশালী যে তা ঠাকুরদার মতো একজন বয়স্ক মানুষের দৃষ্টিকেও নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তাই নিজের নবীন চোখ না থাকলেও অমলের দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য ও মুক্তির আনন্দ দেখতে পান।
B. ‘একি উৎপাত! আমি আসি ভাই!’ — কে, কাকে কথাটি বলেছে? কোন্ বিষয়টি উৎপাত বলে মনে হয়েছে?
১. কে, কাকে কথাটি বলেছে:
- বক্তা: উক্তিটির বক্তা হলেন গ্রামের স্বৈরাচারী ও অহংকারী মোড়ল।
- শ্রোতা: তিনি অসুস্থ ও গৃহবন্দি বালক অমলকে উদ্দেশ্য করে এই কথাটি বলেছেন।
২. কোন্ বিষয়টি উৎপাত বলে মনে হয়েছে:
সংসারের নানা হিসাব-নিকাশ, সামাজিক ক্ষমতা ও জটিলতায় অভ্যস্ত মোড়লের কাছে অমলের সরল ব্যাকুলতা ও কল্পনাপ্রবণ কথাবার্তাই ‘উৎপাত’ বলে মনে হয়েছিল।
- রাজার চিঠির ব্যাকুলতা: অমল পিসেমশাই চণ্ডীপালের কাছে শুনেছিল যে উলটো দিকের নতুন বাড়িটি রাজার ‘ডাকঘর’। সেখান থেকে রাজা একদিন তার নামেও চিঠি পাঠাবেন। মোড়ল পথ দিয়ে যাওয়ার সময় অমল সরল মনে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, রাজার ডাকঘর থেকে তার নামে কোনো চিঠি এসেছে কি না।
- মোড়লকে অস্বস্তিতে ফেলা: মোড়ল ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। অমলের মতো একটি অসুস্থ বালক তাঁকে থামিয়ে রাজার চিঠির কথা জিজ্ঞেস করায় তিনি বিরক্ত হন এবং মনে করেন, অমল যেন তাঁকে ব্যঙ্গ বা উপহাস করছে।
- অচেনা জগতের প্রতি অমলের আকর্ষণ: অমলের মুক্ত আকাশ, অচেনা পথ এবং রাজার চিঠির প্রতি অপার্থিব ব্যাকুলতা মোড়লের কাছে অযৌক্তিক ও বিরক্তিকর বলে মনে হয়েছিল। তার নিজের ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার জগতের বাইরে অমলের এই কল্পনাময় জগতকে তিনি বুঝতে পারেননি।
উপসংহার: অমলের নিষ্পাপ কল্পনা ও রাজার চিঠির প্রতি তার ব্যাকুলতাই মোড়লের কাছে ‘উৎপাত’ বলে মনে হয়েছিল। অমলের মুক্তচিন্তা ও কল্পনার জগতের সঙ্গে মোড়লের সংকীর্ণ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতার এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে নাট্যকার দুটি ভিন্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
C. “বোলো যে, ‘সুধা তোমাকে ভোলে নি।’”— সুধা কেন অমলকে ভোলেনি? সুধা চরিত্রটির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
১. সুধা কেন অমলকে ভোলেনি:
- আন্তরিক স্নেহের টান: সুধা যখন ফুল বিক্রি করতে যেত, জানলায় বসে থাকা অমল তাকে ডেকে দাঁড় করাত। কেনাবেচার সম্পর্কের বাইরে অমল তার সঙ্গে কথা বলত ও ফুল দেখতে চাইত। অমলের এই নিষ্পাপ সান্নিধ্য সুধার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
- প্রতিশ্রুতি রক্ষা: অমল সুধার কাছে বকুল ফুল চেয়েছিল। সুধা তাকে কথা দিয়েছিল যে, বনের কাজ শেষ করে ফেরার পথে সে অমলের জন্য ফুল এনে দেবে।
- ভালোবাসার বন্ধন: দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যেও সুধা অমলকে দেওয়া কথা ভুলে যায়নি। তাই কাজ শেষে বকুল ফুল নিয়ে সে অমলের কাছে ফিরে আসে এবং রাজবৈদ্যকে জানাতে বলে— ‘সুধা তোমাকে ভোলে নি।’
২. সুধা চরিত্রের সংক্ষিপ্ত আলোচনা:
- প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতীক: সুধা গ্রামবাংলার মুক্ত, প্রাণবন্ত ও স্নিগ্ধ প্রকৃতির প্রতীক। সে বনের ফুল তুলে এনে বিক্রি করে এবং তার হৃদয়েও প্রকৃতির মতোই সরলতা ও সৌন্দর্য রয়েছে।
- নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিকতা: অমলের অসুস্থতা ও ঘরবন্দি জীবনের প্রতি সুধার গভীর সহানুভূতি ছিল। কোনো পার্থিব স্বার্থ ছাড়াই অমলের জন্য ফুল নিয়ে আসা এবং তার শেষ মুহূর্তে খবর নিতে আসা তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিকতার পরিচয় দেয়।
উপসংহার: সুধা চরিত্রটি নাটকে ক্ষুদ্র হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অমলের প্রতি তার নির্মল ভালোবাসা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তাকে অমলের পার্থিব জগতের শেষ ভালোবাসার বন্ধন ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত করেছে।
D. ‘ডাকঘর? কার ডাকঘর?’ — ‘ডাকঘর’ শব্দটির সাধারণ অর্থ কী? রবীন্দ্রনাথ কোন্ তাৎপর্যে ‘ডাকঘর’ নাটকটির নামকরণ করেছেন?
১. ‘ডাকঘর’ শব্দটির সাধারণ অর্থ:
- সাধারণ বা লৌকিক অর্থ: সাধারণ অর্থে ‘ডাকঘর’ বা Post Office হলো এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে দূর-দূরান্তে চিঠিপত্র, সংবাদ ও বার্তা পাঠানো বা আদান-প্রদান করা হয়।
- নাটকে অমলের ভাবনা: গৃহবন্দি বালক অমলের কাছে ‘ডাকঘর’ একটি রহস্যময় স্থান, যেখান থেকে রাজা তাঁর অনুচরদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে চিঠি পাঠান।
২. রবীন্দ্রনাথ যে তাৎপর্যে নাটকটির নামকরণ করেছেন:
রবীন্দ্রনাথ ‘ডাকঘর’ শব্দটিকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেননি; এর মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।
- পরমাত্মার আহ্বানের প্রতীক: নাটকের ‘রাজা’ পরমাত্মা বা ঈশ্বরের প্রতীক এবং ‘ডাকঘর’ হলো সেই মাধ্যম, যার সাহায্যে পরমাত্মার বার্তা বা প্রেমের আহ্বান মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
- মুক্তির বার্তার প্রতীক: অমলের ঘরবন্দি ও অসুস্থ শরীর মানুষের সীমাবদ্ধ পার্থিব জীবনের প্রতীক। রাজার ডাকঘর থেকে নিজের নামে চিঠি আসার অপেক্ষা আসলে অমলের অসীমের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ও পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
- মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরম মুক্তি: নাটকের শেষে রাজবৈদ্য এসে অমলের ঘরের দরজা-জানলা খুলে দেন এবং অমল চিরনিদ্রায় ঢলে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে রাজার ডাকঘর থেকে অমলের নামে মুক্তির চিঠি এসে গেছে।
উপসংহার: পার্থিব জীবনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অসীমের আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং পরমাত্মার সঙ্গে আত্মার মিলনের রূপক হিসেবেই ‘ডাকঘর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই গভীর আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী ব্যঞ্জনার কারণেই রবীন্দ্রনাথের নাটকটির নামকরণ ‘ডাকঘর’ অত্যন্ত অর্থবহ ও সার্থক।
৫. যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
A. বাংলা চিত্রকলার ইতিহাসে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।
১. আধুনিক ভারতীয় চিত্ররীতির প্রবর্তন:
অবনীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় তেলরং ও জলরং সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করলেও পাশ্চাত্য শিল্পরীতির অন্ধ অনুকরণকে প্রত্যাখ্যান করেন। অজন্তা, মুঘল, রাজপুত ও পাহাড়ি চিত্রকলার ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি একটি স্বজাতীয় ভারতীয় শিল্পরীতি গড়ে তোলেন।
২. ‘ওয়াশ পদ্ধতি’র প্রয়োগ:
জাপানি চিত্রশিল্পী ইয়োকোয়ামা তাইকান ও হিসিদার সান্নিধ্যে এসে তিনি জাপানি ওয়াশ পদ্ধতির সঙ্গে ভারতীয় চিত্ররীতির সমন্বয় ঘটান। তাঁর ছবিতে এই পদ্ধতির মাধ্যমে কোমল রং, আলো-ছায়া ও মায়াবী আবহের অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে।
৩. বিখ্যাত চিত্রকর্ম:
অবনীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মগুলির মধ্যে রয়েছে—
- ‘ভারত মাতা’: বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আঁকা এই চিত্রটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।
- ‘শাহজাহানের অন্তিমকাল’: তাজমহলের দিকে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধ শাহজাহানের আবেগময় দৃশ্য এই ছবির মূল বিষয়।
- এ ছাড়াও ‘কচ ও দেবযানী’, ‘বুদ্ধ ও সুজাতা’, ‘কৃষ্ণলীলা’ ও ‘অশ্রুমুখী রাধা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
৪. বেঙ্গল স্কুলের প্রতিষ্ঠা:
ই. বি. হ্যাভেলের সহযোগিতায় অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় ঐতিহ্যনির্ভর ‘বেঙ্গল স্কুল’ বা বেঙ্গল শৈলীর বিকাশ ঘটান। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে নন্দলাল বসু, অসিতকুমার হালদার ও ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মাধ্যমে এই শিল্পধারা পরবর্তীকালে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
৫. শিল্পচিন্তা ও ‘কুটুমকাটাম’:
শিল্পচর্চার পাশাপাশি অবনীন্দ্রনাথের সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ‘কুটুমকাটাম’-এ। কাঠ, গাছের ডালপালা, শিকড় প্রভৃতি দিয়ে তিনি অভিনব শিল্পকর্ম তৈরি করতেন। তাঁর শিল্পভাবনা ও নন্দনতত্ত্বের পরিচয় বিভিন্ন রচনা ও গ্রন্থেও পাওয়া যায়।
উপসংহার: পরাধীন ভারতে পাশ্চাত্য অনুকরণের যুগে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় চিত্রকলাকে তার নিজস্ব ঐতিহ্য, পরিচয় ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ভারতীয় শিল্পরীতির পুনর্জাগরণ ও বেঙ্গল স্কুলের বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
B. তথ্যচিত্র কাকে বলে? বাংলা তথ্যচিত্রের ধারা সম্বন্ধে যা জানো লেখো। (৫)
বাংলা তথ্যচিত্রের ধারা:
- প্রারম্ভিক পর্ব: বাংলায় তথ্যচিত্র নির্মাণের সূচনায় হীরালাল সেন-এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ১৯০১ সালে তিনি কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে অনুষ্ঠিত নাটক ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বাস্তব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। তাঁর কাজগুলি বাংলা তথা ভারতীয় তথ্যচিত্রের প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
- স্বদেশি আন্দোলন ও স্বাধীনতা-পূর্ব ধারা: ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বাস্তব দৃশ্য চলচ্চিত্রে ধারণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সংবাদভিত্তিক ছোট ছোট চলচ্চিত্রও এই সময় নির্মিত হতে থাকে।
- সত্যজিৎ রায়ের অবদান: সত্যজিৎ রায়ের হাতে বাংলা তথ্যচিত্র আন্তর্জাতিক মান ও শৈল্পিক মর্যাদা লাভ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্রের মধ্যে ‘রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৬১), ‘দ্য ইনার আই’ (১৯৭২), ‘সিকিম’ (১৯৭১) এবং ‘সুকুমার রায়’ (১৯৮৭) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের অবদান: ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন তাঁদের তথ্যচিত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সমকালীন বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের কাজ বাংলা তথ্যচিত্রের ধারাকে আরও সমাজসচেতন ও বাস্তবমুখী করে তোলে।
- পরবর্তী পর্ব ও আধুনিক ধারা: পরবর্তীকালে হরিসাধন দাশগুপ্ত, পূর্ণেন্দু পত্রী, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ পরিচালক সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকশিল্প, ইতিহাস ও প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
উপসংহার: কাল্পনিক বিনোদনের গণ্ডি অতিক্রম করে ঐতিহাসিক সত্য, সামাজিক বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে ক্যামেরার মাধ্যমে নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলা তথ্যচিত্রের ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। সময়ের সঙ্গে বিষয় ও নির্মাণশৈলীর পরিবর্তন ঘটলেও বাস্তবতাকে সৃজনশীলভাবে তুলে ধরাই এই ধারার মূল বৈশিষ্ট্য।
৬. নিম্নলিখিত যে-কোনো একটি বিষয় নির্বাচন করে, নির্দেশ অনুসারে কমবেশি চারশো শব্দে একটি প্রবন্ধ রচনা করো: (১×১০=১০)
A. ‘পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ’ — বিষয়টি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ রচনা করো।
বিগত শতাব্দীর বিশ্বযুদ্ধ ও সভ্যতার অগ্রগতির ফলে মানবজীবনে নানা উন্নতি ঘটলেও মানুষের শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকখানি বিঘ্নিত হয়েছে। স্বার্থের সংঘাত, লোভ এবং সম্পদের বৈষম্যের পাশাপাশি পরিবেশের ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ আজ মানবসভ্যতাকে বিপন্ন করে তুলেছে। দারিদ্র্য যেমন মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তেমনই নষ্ট হয়েছে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। তাই আজ পরিবেশ রক্ষা মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত।
সভ্যতার অগ্রগতি ও প্রকৃতির বিনাশ:
অষ্টাদশ শতকের শিল্পবিপ্লবের পর যন্ত্রনির্ভর মানবসভ্যতা দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকৃতির সুরক্ষা হয়নি। মানুষের আধুনিক জীবনযাত্রার সুবিধার জন্য নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন, নদীদূষণ ও অরণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে। কলকারখানার ধোঁয়া, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং যানবাহনের ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করছে। সবুজ অরণ্য ধ্বংস করে গড়ে উঠছে কংক্রিটের জঙ্গল। ফলে মানুষ নিজেই নিজের অস্তিত্বের জন্য বিপদ ডেকে আনছে।
বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন:
পরিবেশ দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জলবায়ুর ওপর। গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নির্গমনের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন আজ একটি বড় সমস্যা। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে এবং উপকূলবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঋতুচক্রের স্বাভাবিক ছন্দও পরিবর্তিত হচ্ছে। অসময়ে বন্যা, অতিরিক্ত খরা, তীব্র দাবদাহ, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রকোপ মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
দারিদ্র্য, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের বিপন্নতা:
পরিবেশের অবক্ষয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর। বনজ সম্পদ কমে যাওয়া এবং জলদূষণের ফলে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা সংকটে পড়ছে। সুপেয় জলের অভাব ও বায়ুদূষণের কারণে নানা রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে বহু মানুষ নিজেদের বাসস্থান হারিয়ে ‘পরিবেশগত শরণার্থী’-তে পরিণত হচ্ছে। ফলে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান আজ গুরুতর সংকটের মুখে।
সংকট মোচনের উপায়:
পরিবেশ রক্ষা ও মানবজাতিকে বিপন্নতার হাত থেকে বাঁচাতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—
- ব্যাপক বৃক্ষরোপণ: নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন বন্ধ করে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ এবং অরণ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
- নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার: কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
- প্লাস্টিক বর্জন ও সচেতনতা: একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে বা বন্ধ করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
- আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: কার্বন নির্গমন কমাতে কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
উপসংহার:
প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব অসম্ভব। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আকুল আবেদন ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’ আজ শুধু কাব্যের পংক্তি নয়, মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। প্রকৃতিকে তার হারিয়ে যাওয়া সবুজ ফিরিয়ে দিয়ে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
B. কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসু সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
বিংশ শতাব্দীর বাংলা কথাসাহিত্য ও আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জগতে সমরেশ বসু এক বিশিষ্ট নাম। গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবন ও মনস্তত্ত্বের বাস্তব চিত্র তিনি তাঁর সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। জীবনসংগ্রাম, সমাজচেতনা ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীলতায় তাঁর সাহিত্য সমৃদ্ধ।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়:
সমরেশ বসু ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বিক্রমপুর পরগণার রাজানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল সুরথনাথ বসু। তাঁর পিতার নাম মোহিনীমোহন বসু এবং মায়ের নাম শৈবলিনী বসু। আর্থিক অনটনের মধ্যেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়।
জীবনসংগ্রাম ও সাহিত্যজীবনের সূচনা:
সমরেশ বসুর জীবন ছিল নানা অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন কাজ করেছেন এবং ইছাপুরের ‘গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরি’-তে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করেন। এই সময় তিনি মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দি অবস্থায় তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেন। শ্রমজীবী মানুষের জীবন, কারখানার পরিবেশ ও কঠোর বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ছদ্মনাম ও সাহিত্যকর্ম:
সমরেশ বসু ‘কালকূট’ ও ‘ভ্রমর’ ছদ্মনামে বহু উল্লেখযোগ্য রচনা প্রকাশ করেন। তাঁর রচনায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন, প্রেম, সংগ্রাম ও মনস্তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে।
- উপন্যাস: ‘বি. টি. রোডের ধারে’, ‘গঙ্গা’, ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’, ‘স্বীকারোক্তি’, ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।
- কালকূট নামে রচনা: ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ প্রভৃতি ভ্রমণধর্মী ও জীবনমুখী রচনায় তাঁর ভিন্নধর্মী সাহিত্যপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।
- কিশোর সাহিত্য: কিশোর পাঠকদের জন্য তিনি জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘গোগোল’ সৃষ্টি করেন। গোগোলকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর কিশোর কাহিনিগুলি বিশেষ জনপ্রিয়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
বাংলা কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সমরেশ বসু ‘আনন্দ পুরস্কার’ লাভ করেন। তাঁর বিখ্যাত ‘শাম্ব’ উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার-এ ভূষিত হন।
জীবনাবসান ও উপসংহার:
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ সমরেশ বসুর জীবনাবসান ঘটে। জীবন ও সমাজের কঠোর বাস্তবতাকে সাহিত্যে তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি মানুষের অন্তর্লোক ও জীবনসংগ্রামকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর বহুমুখী সাহিত্যসৃষ্টি বাংলা কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সমরেশ বসু চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
